শরীকী কুরবানী দেয়ার বিধি-বিধান

0
50

মুফতী মাহমুদ হাসান : শরীকানা বা ভাগে কুরবানী করা সর্বস্বীকৃত একটি বিষয়।যে বিষয়ে ছিল না কোনো দ্বিধা দ্বন্দ্ব, ছিল না কেন সন্দেহের অবকাশ।সম্প্রতি এ বিষয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। অপপ্রচার করা হচ্ছে শরিকানা বা ভাগে কুরবানী করা শরীয়ত সম্মত নয়।কিছু জ্ঞানপাপী ব্যক্তি সরলাপন মুসলমানদেরকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। সন্দেহের কালো ছায়ায় মুসলিম উম্মাহকে ছেয়ে দেয়ার  অপচেষ্টাই মেতে উঠেছে।কুরবানী আত্মত্যাগ, আনুগত্য,ভালবাসা প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম। তাই তো সচ্ছল অসচ্ছল সবাই একক বা ভাগে কুরবানীর মাধ্যমে ত্যাগ, ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে চায়।তাই আসুন আমরা জেনে নেই তাদের কথার সত্যতা কতটুকু।এ বিষয়ে সুন্নাহর আলোকে দিক নির্দেশনা কি? শরিকানা বা ভাগে কুরবানী করার বিধান কি?

শরীকানা বা ভাগে কুরবানী কি জায়েয?

হ্যাঁ।শরীকানা বা ভাগে কুরবানী করা জায়েয এবং শরীয়ত সম্মত।সামর্থ্যবান,অসামর্থ্যবান সবার জন্য শরীকানা বা ভাগে কুরবানী দেয়া শরীয়ত সম্মত। তবে সামর্থ্যবান ব্যক্তির পক্ষে একা কোরবানি করা বিভিন্ন কারণে উত্তম। তবে শরিকে/ভাগে কুরবানীর বিধান উম্মতকে দিয়েছে অবকাশ ও প্রশস্ততা। এই প্রশস্ততা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহয় স্পষ্টভাবে আছে।

যেমন হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ র: থেকে বর্ণিত।

عن جابر بن عبدالله قال نحرنا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم عام الحديبية البدنة عن سبعة والبقرة عن سبعة

জাবের বিন আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা হুদায়বিয়ার সনে উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং গরুও সাত জনের পক্ষ থেকে কোরবানী করেছিলাম। (সহীই মুসলিম হা- ২৩২২, আবুদাউদ হা- ২৮০৯, তিরমিযী হা- ১৪২২, ইবনু মাজাহ হা- ৩১৩২)

হযরত ইবনে মাসঊদ রা. থেকে এক বর্ণনা পাওয়া যায়,
قال: وثنا يوسف بن أبي يوسف عن أبيه عن أبي حنيفة، عن حماد، عن إبراهيم، عن ابن مسعود رضي الله عنه أنه قال: «البقرة تجزئ في الأضحى عن سبعة أناس» الآثار لأبي يوسف (ص: 62)

হযরত আবু ইউসূফ র. ইমাম আবু হানীফার সূত্রে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউস রাযি. এর বক্তব্য বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, কুরবানীর ক্ষেত্রে একটি গরু সাতজন ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট।
[সূত্রঃ কিতাবুল আসার, পৃ. ৬২, হাদীস ৩০৮]।
এই আসারে মুকিম নাকী মুসাফির পার্থক্য না করেই সাতজন শরীক হবার কথা এসেছে।

 একটি গরুতে সাত শরিক হয়ে কুরবানী করা হাদিসে প্রমাণিত আছে।
ﻓﺄﻣﺮﻧﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﺃﻥ ﻧﺸﺘﺮﻙ ﻓﻲ ﺍﻹﺑﻞ ﻭ ﺍﻟﺒﻘﺮ، ﻛﻞ ﺳﺒﻌﺔ ﻣﻨﺎ ﻓﻲ
জাবের রাঃ বলেন আমরা রাসুলুল্লাহ সাঃ এর সাথে সফরে ছিলাম। যখন কুরবানীর সময় এল, তখন রাসুলুল্লাহ সাঃ আমাদের কে আদেশ করলেন যেন আমরা গরু ও উটে শরিকে কুরবানী করি। আমরা একটি গরু ও উটে সাত জন করে শরিক হয়েছিলাম। সহিহ মুসিলম ৬/৪৭৪, হাদিস ২৩২৩, মুসনাদু আহমদ ২৮/১৫১, হাদিস ১৩৬০২।

অন্য বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (একটি) গরু সাতজনের পক্ষ থেকে এবং (একটি) উট সাতজনের পক্ষ হতে (কোরবানি করা যায়)।—(সুনানে আবু দাউদ ২/৩৮৮।)

উপরে উল্লেখিত হাদীস দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায় সুন্নাহর আলোকে শরিকানা বা ভাগে কুরবানী করা শরীয়ত সম্মত। এতে সন্দেহ করার কোনো অবকাশ নেয় বরং তা হাদিস অস্বীকার করার অন্তর্ভুক্ত।

শরীকানা কুরবানীর বিধি-বিধান

১. মাসআলা:
ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা এ তিন প্রকার পশু দ্বারা কেবল একজনের পক্ষ থেকে কুরবানী করা যায়৷ এ তিন প্রকার পশুতে শরীকী কুরবনী সহীহ হবেনা৷ (সহীহুল বুখারী ৫৫৫৩ হাদীস৷
ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০১ পৃষ্ঠা৷)

২. মাসআলাঃ
উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে, কারো কুরবানী সহীহ হবেনা। তবে সাতের কম জোড় বা বিজোড় যে কোন সংখ্যক যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় শরীক হতে পারবে। (সুনানে আবু দাউদ ২৮০৮ হাদীস৷ সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৩২ হাদীস৷
ফতোয়ায়ে শামী ৫/২০০ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭ পৃষ্ঠা৷)

৩. মাসআলাঃ
সাত ভাগে কুরবানী করলে সবার ভাগ সমান হতে হবে। কারো ভাগ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ কারো দেড় ভাগ এমন হলে কারো কুরবানী সহীহ হবেনা। (খোলাসাতুল ফতোয়া ৪/৩১৫ পৃষ্ঠা৷
আহসানুল ফতোয়া ৭/৫০৭ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭ পৃষ্ঠা৷)

৪. মাসআলাঃ
শরীকী কুরবানী করলে, সকলের নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। অন্যথায় যদি কোন শরীকের নিয়ত গলদ থাকে, যেমন লোক দেখানো বা গোশত খাওয়া ইত্যাদি, তবে করো কুরবানী সহীহ হবেনা। তাই শরীক নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত (সহীহুল বুখারী ৫৫৪৯ হাদীস৷ ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৪৯ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮ পৃষ্ঠা৷)

৫. মাসআলাঃ
কোন শরীকের পূরো বা অধিকাংশ উপর্জন যদি হারাম হয়, অথবা কেউ হারাম উপার্জন দ্বারা শরীক হয়, তাহলে কারো কুরবানী সহীহ হবেনা।
(ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ২৬/৩০৮ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে হক্কানিয়া ৬/৪৮১ পৃষ্ঠা৷ কিফয়াতুল মুফতী ৮/২০৫ পৃষ্ঠা৷)

৬. মাসআলাঃ
সুদখোর ও ঘোষখোরের সঙ্গে কুরবানী সহীহ হবেনা৷ তবে সে যদি হালাল টাকা দিয়ে শরীক হয়, তবে কুরবানী সহীহ হবে৷ (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ২৬/৩০৮ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে হক্কানিয়া ৬/৪৮১ পৃষ্ঠা৷
কিফয়াতুল মুফতী ৮/২০৫ পৃষ্ঠা৷)

৭. মাসআলাঃ
কুরবানীর পশু ক্রয় করার পুর্বেই অংশীদার নির্দিষ্ট করে নেয়া উচিত৷ তবে ধনী ব্যক্তি পশু ক্রয় করার পরও অংশীদার শরীক করতে পারবে৷ কিন্তু অনুত্তম হবে৷ আর গরীব ব্যক্তি অর্থাৎ তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয় সে পশু ক্রয় করার পর কাউকে শরীক করতে পারবে না। তবে পশু ক্রয়ের পুর্বে যদি শরীকের নিয়ত থাকে তাহলে অংশীদার নিতে পারবে৷ (মুয়াত্তা মালিক ১০২৮ হাদীস৷ আল-হিদায়া ৪/৩৭৭ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০ পৃষ্ঠা৷)

৮. মাসআলাঃ
কুরবানীর পশু জবেহ করার পর কাউকে অংশীদার শরীক করা জায়েয হবেনা৷ যদি করে তবে কারো কুরবানী সহীহ হবেনা৷ (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া ৪/৩০৯ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০ পৃষ্ঠা৷)

৯. মাসআলাঃ
কুরবানীর পূর্বে কোন শরীকের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানীর অনুমতি দেয়, তবে জায়েয হবে। অন্যথায় ঐ শরীকের টাকা ফেরত দিতে হবে। তবে এক্ষেত্রে তার স্থলে অন্য কাউকেও শরীক করতে পারবে। (ফতোয়ায়ে কাযীখান ৩/৩৫১ পৃষ্ঠা৷ বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯ পৃষ্ঠা৷

১০ মাসআলাঃ
কুরবানীর পশুতে অন্য নিয়তে যারা শরীক হতে পারবে৷
১৷ আকীকার নিয়তে৷
২৷  মান্নত৷
৩৷ হজ্বের কুরবানীর নিয়তে৷
এছাড়া অন্য কোন নিয়তে কুরবানীর পশুতে শরীক হওয়া জায়েয হবেনা৷ (আহসানুল ফতোয়া ৭/৫৩৬ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে রহমানিয়া ১/৪৯৭ পৃষ্ঠা৷ ফতোয়ায়ে ইউনুছিয়া ২/৫৪৩ পৃষ্ঠা৷)

১১. মাসআলা :

 যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা কোরবানি দেওয়ার নিয়্যাতে কিনে আনে আর সে ধনী হয় তাহলে তার জন্য এ পশুতে অন্যকে শরিক করা জায়েজ হলেও শরিক না করে একা কোরবানি করাই শ্রেয়। শরিক করলে ওই অংশের টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি গরিব হয়, যার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয়, তাহলে যেহেতু কোরবানির নিয়্যাতে পশুটি ক্রয় করার মাধ্যমে লোকটি তার পুরোটাই আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, তাই তার জন্য এ পশুতে অন্যকে শরীক করা জায়েজ নয়। যদি শরিক করে তবে ওই টাকা সদকা করে দেওয়া জরুরি। গরিব ব্যক্তি কোরবানির পশুতে কাউকে শরিক করতে চাইলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়্যাত করে নিতে হবে। (হেদায়া ৪/৪৪৩, কাযীখান ৩/৩৫০-৩৫১)

১২. মাসআলা :

 শরিকে কোরবানি করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েজ নেই। (আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭,কাযীখান ৩/৩৫১)

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বিধান জেনে আমল করার তাওফিক দিক।

মুফতি মাহমুদ হাসান 

*দারুল হাদীস (এম.এ,ইসলামিক স্টাডিস)

জামিয়াতুল আবরার বসুন্ধরা ঢাকা।

*আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ(অনার্স) ঢাকা।

*দারুল ইফতা  (ইসলামিক আইন ও গবেষণা বিভাগ) ঢাকা।

watch price in bangladesh

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here