খাও তোমাদের সাথে আর দেখা হবে না, আমার বদলি হয়েছে

0
48

লালমনিরহাট রেল স্টেশনের পুরাতন প্লাটফর্মের সাধারণ যাত্রী বসার আসনে একজন বাকঁ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ভবঘুরে মহিলা দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। তার পাশেই বসে আছেন মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক।

পরম মমতায় তিনি তাকিয়ে আছেন সেই ভবঘুরে প্রতিবন্ধী মহিলার দিকে। এক পর্যায়ে ওই ভদ্রলোক পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে বলতে থাকলেন,‘ খাও তোমাদের সাথে আর দেখা হবে না, আমার বদলী হয়েছে। আমি আজ চলে যাচ্ছি। আল্লাহ্ অবশ্যই তোমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।’

এভাবেই কথা গুলো বলছিলেন লালমনিরহাট সদর থানার সাবেক ওসি তদন্ত ও সদ্য সাবেক কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক রায়হান আলী। কথা গুলোই বলেই কিছু টাকা বের করে দেন মহিলাটিকে তিনি। টাকা নিয়ে খাওয়া বাদ দিয়েই কান্নাকাটি শুরু করে কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভদ্রলোকের পা জড়িয়ে ধরে অস্পষ্ট ভাষায় বলতে থাকল না না। বুঝতে দেরি হল না যে,‘ তিনি বলতে চাচ্ছেন আপনি কোথাও যাবেন না, আর কে আসবে আমাদের খোঁজ নিতে ?

ভদ্রলোকের চোখ দুটিও তখন ছলছল করছিল যেন এক অন্য রকম মায়ায়। একপর্যায়ে তাকে আবারও যাত্রী আসনে বসিয়ে বোঝালেন,‘ তাকে যেতেই হবে। ’ আর দেরি করলেন না তিনি দ্রæত উঠে আরও কাউকে খুঁজতে থাকলেন। এবার পেলেন আরও একজনকে। ভদ্রলোককে দেখা মাত্রই দৌড়ে কাছে চলে আসলেন আর এক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা। তিনি কাছে এসেই বলতে থাকলেন,‘ আইজ এতো সকালে কেন আইছ বাবা, রাইতে ডিউটিতে যাইবা নাকি?’ ভদ্রলোকের চোখ ছলছল , কন্ঠ ভারী হয়ে আসছে।

মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে দিয়ে শুধু বললেন,‘ বাকি ওষুধগুলো এই টাকা দিয়ে কিনে খাবা, আমার বদলী হয়েছে চাচী হয়তো আর এভাবে দেখা হবে না।’ বৃদ্ধা মহিলা কথাটি শুনেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন। এক অন্যরকম আবেগঘণ পরিবেশের সৃষ্টি হয় সেখানে। ভদ্রলোকটিও অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন, শক্ত থাকার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। হাত দিয়ে চোখ মুচতে মুচতে কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন নতুন প্লাটফর্মের দিকে।

পুলিশ পরিদর্শক রায়হান আলীর সম্প্রতি গাইবান্ধা জেলায় বদলি হলে তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে লালমনিরহাট ত্যাগ করার পূর্ব মুহুর্তে বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে যেয়ে যেয়ে দেখা করেন এমন অনেক ভবঘুরে মানসিক ও শারীরীক প্রতিবন্ধী মানুষের সাথে।

স্টেশন এলাকায় একে একে সবার সাথে দেখা করে বিদায় নেয়ার বেলায় পুলিশ কর্মকর্তা রায়হান আলীর সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও একপর্যায়ে বলেন,‘ করোনা কালের শুরুর দিকে যখন সাধারণ ছুটি ঘোষনা করা হয়, তখন পুরো দেশব্যাপী চলছিল কঠোর লকডাউন।’ সাধারণ ছুটির কারনে আদালত বন্ধ হওয়ায় তেমন কাজ ছিল না তার হাতে। এরই মধ্যে চারপাশে ত্রাণ নিয়ে ছোটাছুটি শুরু হয়।

কিন্তু ভবঘুরে এসব মানুষের কথা কেউ ভাবছিল না। রাস্তায় মানুষ বের না হলে এদের দুই একটি টাকা দিয়ে কে সাহয্য করবে এই বিষয়টি ভাবাতে থাকে তাকে। এরই মধ্যে জেলার সেই সময় যোগদান করা নতুন পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানার কাছ থেকে প্রেরণা পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন,‘ লালমনিরহাটে পুলিশ সুপার আবিদা স্যার যোগদানের পর তার বিভিন্ন মানবিক কর্মকান্ড থেকে প্রেরণা পেয়েছেন তিনি।’

তিনি আরও বলেন,‘পুলিশ সুপার করোনা কালে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে বের হতেন, বিভিন্ন চেক পোষ্টে যেয়ে সাধারন অফিসার ও ফোর্সদের সাথে কথা বলতেন, তাদের সাথে রাস্তায় দাড়িয়ে ইফতার করতেন এবং জেলার অনেক দরীদ্র মানুষের বাড়িতে খাদ্য সামগ্রী থেকে কারো কারো চিকিৎসার জন্য টাকাও পাঠাতেন।’ পুলিশ সুপার বারবার বলতেন, গতানুগতিক ধারার পুলিশিং তিনি চান না, মানবিক পুলিশিং দেখতে চান তিনি।’

তিনি বলেন,‘ মূলত এসপি স্যারের কর্মকান্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং নিজের উপলব্ধিবোধ থেকে ও শিক্ষিকা সহর্ধমিনীর সহযোগিতায় লকডাউন চলাকালে ভবঘুরেদের পাশে দাড়াতে মনস্থির করেন এবং নিজেই প্রতিদিন রাতে বের হয়ে স্টেশন এলাকা, বাস টার্মিণাল এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ভবঘুরে মানসিক ও শারীরীক প্রতিবন্ধীদের দেখা করে কখনও নগদ টাকা আবার কখনও রান্না করা খাবার কখনো শুকনো খাবার কখনও ওষুধ কিনে দিতেন ।

আর এই মহতী কাজে তার স্ত্রী তাকে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছে বলে তিনি টানা ৩ মাসেরও বেশি সময় ধরে লোকগুলোকে একবেলা খাওয়াতে পেরেছেন। ‘কোনও দিন ১০ জন কোনও দিন ২০ জনকে পর্যন্ত সহযোগিতা করেছেন।’

তার মধ্যে এমন ৫ জন প্রতিবন্ধী ছিলেন যাদের প্রতিদিনই পেতেন তিনি। বদলীর কারনে যেতে হচ্ছে সেজন্য মন খারাপ নেই তার, কিন্তু আজ তাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে এসে খুব খারাপ লাগছে। এই কয়েকদিনে এই মানুষগুলোর কাছে আমি একটা ভরসাস্থল ছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা মেনে নিতে হবে তো। এছাড়াও দিন হওয়ায় অনেকের দেখাও পাননি সেজন্যও মন খারাপ লাগছে বলে জানান।

পরিশেষে তিনি আরও বলেন,‘ এই মানুষগুলোর প্রতি সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষগুলো যেন একটু খেয়াল রাখেন। তাদের চাহিদা অনেক কম। কোনও রকম একটু ডাল আর ভাত হলেই তারা সন্তুষ্ট হয়।
এদিকে পুলিশ পরিদর্শক রায়হান আলীর স্টেশন এলাকায় এসে নিয়মতি ভবঘুরেদের সহযোগিতার বিষয়টি নিয়ে স্টেশন এলাকার কয়েকজন কুলির সাথে কথা হলে তারা জানান, ‘ তিনি যে পুলিশ অফিসার তা আমরা বুঝতেই পারি নি কখনও।’

প্রায় আমরা দেখতাম তিনি স্টেশনের পাগল ও প্রতিবন্ধী মানুষদের কাছে আসতেন খাবার নিয়ে, কখনো টাকা নিয়ে। আমরা ভেবেছিলাম তিনি কোনও জনদরদী ব্যবসায়ী হবেন।‘ পুলিশের একজন বড় কর্মকর্তা হয়েও তিনি যেভাবে করোনাকে ভয় না পেয়ে এইসব মানুষের পাশে আসতেন তা নিজের চোখে না দেখলে আমরাও বিশ্বাস করতে পারতাম না পুলিশ এতো ভালো হতে পারে।’

প্রসঙ্গত, লালমনিরহাট জেলায় ৩ বছরের বেশি সময় চাকুরি করা এই পুলিশ পরিদর্শকের এমন মানবিকতার বিষয়টি আজ বিকেলে স্টেশন এলাকায় প্রকাশ হয়ে গেলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন,‘ এ যেন মানবিক পুলিশ অফিসারের অন্য রকম এক ফেয়ার ওয়েল।’

watch price in bangladesh

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here