সোনালী যুগের শেষ নক্ষত্র সুপারস্টার শাকিব খান

0
10
মাহমুদ খান: আমাকে প্রায়ই অনেকে প্রশ্ন করেন- ‘শাকিব খানের পর সিনেমায় আর নায়ক আসেনি কেন?’ আজকের দিনটি এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য উপযুক্ত।
শাকিব খান যখন ঢাকাই সিনেমা মুল্লুকে পা দেন, তখন রূপালি জগতের রমরমা অবস্থা, ফিল্মের ব্যবসা তুঙ্গে। মান্না-ডিপজলের অ্যাকশন ছবির মার মার কাট কাট আর রিয়াজ-শাবনূরের রোমান্টিক উপস্থাপনার তুমুল চাহিদা। চারদিকে গ্ল্যামারের ছড়াছড়ি। মৌসুমী, পপি, পূর্ণিমা; প্রত্যেকেই ধাউ ধাউ করে জ্বলছেন। এ বলে আমায় দেখো ও বলে আমায় দেখো। ঢাকাই সিনেমার মৌচাকের এমনই সুঘ্রাণ, কলকাতা থেকে ছুটে আসছেন ঋতুপর্ণা-রচনা-প্রিয়াংকা, মুম্বাই থেকে উঁকি মেরে যাচ্ছেন মমতা কুলকার্নি। আর নায়কদের হাল! রুবেলের নামেই ছবিঘর হাউজফুল। ইলিয়াস কাঞ্চন তখনও হিট মেশিন। প্রেমের ছবি বললেই খোঁজ পড়ছে শাকিল খান আর ফেরদৌসের।
কঠোর-কঠিন এক প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে শাকিব খানকে নামতে হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। কেউ মুখে তুলে খাইয়ে দেয়নি তাকে। নিজেকে প্রমাণ করেই তবে তার জায়গা হয়েছিল তখনকার তারকাখচিত ঢালিউডে। সুপারষ্টারদের মিছিলে নিজের সামান্য অবস্থান করতে তাকে শিখতে হয়েছিল শীর্ষ নায়কদের প্রত্যেকের কায়দা, কানুন, কৌশল। তারকা নায়কদের সবার সঙ্গেই স্ক্রিন শেয়ার করেছেন শাকিব খান। এফডিসিতে খুব কাছ থেকে তিনি দেশের শ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের শ্রম-নিষ্ঠা-পেশাদারিত্ব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন। রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানারা তখনও মাঠের সিনিয়র খেলোয়ার। ক্যামেরার সামনে তাদের অগ্নিমূর্তি আর ক্যামেরার পেছনে কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা রানা নামের এক তরুণকে লম্বা রেসের ঘোড়া হতে জ্বালানীর যোগান দিয়েছিল।
আসুন নির্মাতাদের কথায়। এফ আই মানিক আর সোহানুর রহমান সোহান যখন মেধার উত্তাপে টগবগ করে ফুটছেন তখন শাকিব খান তাদের সঙ্গে কাজ করে জেনেছেন সুনির্মাতারা একজন অভিনেতার ভেতর কোন কোন গুণ প্রত্যাশা করেন। আমজাদ হোসেন, চাষী নজরুল ইসলাম, দীলিপ বিশ্বাস, আজিজুর রহমান, শহীদুল ইসলাম খোকন, জাকির হোসেন রাজু; এই সুদক্ষ নির্দেশকদের প্রত্যেককে সন্তুষ্ট করে করেই শাকিব খান শিখেছেন কীভাবে যেকোনো নির্মাতার প্রিয় শিল্পীর তালিকার নাম ঢোকাতে হয়। আর যে নির্মাতাদের সঙ্গে শাকিব খান কাজ করেননি অথচ যারা জ্ঞানে-গুণে-মননে সিনেমার সেরা নির্মাতা, তাদেরকেও নায়ক পেয়েছেন হয় পরামর্শদাতা নয় অনুপ্রেরণা হিসেবে।
শাকিব খান বড় বড় প্রডাকশন হাউজকে কর্মচঞ্চল দেখেছেন। প্রভাবশালী প্রযোজকদের সান্নিধ্য পেয়েছেন। কাকরাইলে টাকার ওড়াউড়ি দেখেছেন। যে ১৪০০ সিনেমা হলের গল্প আজ সবার কণ্ঠের হাহাকার, সেই সিনেমা হলগুলোকে বাণিজ্য করতেও দেখেছেন আজকের ২০০ সিনেমা হলের সবেধন নীলমণি শাকিব খান।
শাকিব খান হচ্ছেন এদেশের সিনেমা জগতের সোনালি সময়ের শেষ তারকা। তিনিই একালের একমাত্র নায়ক যিনি সিনেমার প্রদীপের নিভু নিভু আলোটুকু আশ্চর্য চোখ মেলে দেখেছেন আর যতটুকু পেরেছেন সেই আলো নিজের ভেতরে শুষে নিয়েছেন। তার পরে যত নায়ক যত যোগ্যতা নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে আসুন না কেন; তারা দেশের কিংবদন্তি ডিরেক্টর বলুন আর পারফরমারই বলুন, তাদের কাউকেই পাওয়ার মতো পাননি। সোহানুর রহমান, মতিন রহমান, মনতাজুর রহমানরা যেভাবে দিনের পর দিন লেগে থেকে একজন নায়ককে মূর্তির মতো গড়ে তুলতেন, তাদেরকে সিনেমার লড়াকু পরিবেশে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতেন; সেই উৎসর্গী মনোভাবের নির্মাতার অভাবেই আজকের নায়কদের পক্ষে ‘শাকিব খান’ হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
আজকের নায়কদের চারপাশে নেই উজ্জল, ববিতা, দিলদার, রাজিব, ফরিদীর মতো নক্ষত্রদের বিচরণ। তারা কার কাছে শিখবেন? কাকে অনুসরণ করবেন? কোথায় কাজী হায়াতের মতো পিতৃতুল্য পরিচালক (গডফাদার) যিনি কাঁদা-মাটি মাখিয়ে আরেকজন মান্না তৈরি করে দেবেন? মাসুদ পারভেজের মতো বিগ ব্রাদারও আর হবে না, রুবেলের মতো নায়কেরও জন্ম হবে না। আজকের নায়কদের মতো অভাগা-দুর্ভাগা আর নেই। শাকিব খান এই বঞ্চিতদের ভিড়ে একমাত্র ব্যতিক্রম। সিনেমার সুসময়ের সবটুকু রস পেয়ে এক ফলবান বৃক্ষে পরিণত হয়েছেন তিনি।
১৯৯৯ সালের ২৮ মে থেকে ২০১৯ সালের ২৮ মে পর্যন্ত শাকিব খানের যা কিছু অর্জন, প্রাপ্তি, সংযোগ; সবকিছুর ভিত্তি গড়ে দিয়েছে বাংলা সিনেমার সেই স্বর্ণালি অতীত। আমাদের সেলুলয়েড-যুগের সর্বশেষ প্রতিনিধি শাকিব খান। নায়ক হিসেবে যেদিন তার বাজার পড়ে যাবে, তার চুলে পাঁক ধরবে, তার দেহে ভাজ পড়বে; সেদিনও তিনি ক্লান্ত শরীরে ঢালিউডের সমৃদ্ধ অতীতেরই ভার বইবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here