জমির নেশা সাবেক সচিবের

0
124

ছিলেন সরকারের অতিরিক্ত সচিব। অবসরে এসে নাটোর সদর উপজেলার ভাতুরিয়া গ্রামে বাস করছেন।

গ্রামের লোকজনের উপকার করা তো দূরের কথা, তাদের ভিটাছাড়া করার চিন্তায় দিন কাটে তাঁর।

এরই মধ্যে ওই গ্রামে ৫০ বিঘা জমি কিনেছেন। আরো কিনতে চান। যাঁরা জমি বেচতে চান না তাঁদের হুমকি দেন। চলাফেরায় বাধা সৃষ্টি করেন। এতেও কাজ না হলে মিথ্যা মামলা দেন। থানা পুলিশ মামলা নিতে না চাইলে ঊর্ধ্বতনদের মাধ্যমে চাপ দেন। সব মিলিয়ে তিনি গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে প্রায় ২৭টি মামলা করেছেন। গ্রামবাসী তাঁর হাত থেকে মুক্তি পেতে এরই মধ্যে মানববন্ধন করেছে।

তাঁর নামে পাঁচটি মামলাও করেছে। কিন্তু থামেননি অভিযুক্ত নুরুন্নবী ওরফে বারী মৃধা। সরেজমিনে ওই গ্রাম ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

ওই গ্রামের বাসিন্দা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পিয়ন আব্দুল হাকিম বলেন, ‘আমি কর্মচারী। অথচ, আমার জমি কেনার জন্য তিনি উঠেপড়ে লেগেছেন। জমি না বেচায় তিনি আমাকে বদলি করার জন্য আমার অফিসে চারবার এসে তদবির করেছেন। সব সময় তিনি আমাকে ফোন দিয়ে ভয়ভীতি দেখান। জমি বেচলে তিনি আর কোনো কিছু করবেন না বলে জানিয়েছেন। ’

শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি আমার বাড়ির পেছনের কৃষিজমি কিনে নিয়ে তাতে চারপাশে দেয়াল তুলে দিয়েছেন। আমরা বংশানুক্রমে জমির আইল দিয়ে চলাফেরা করতাম। মাঠ থেকে ফসল তুলতাম। এখন তা বন্ধ হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পানি চলাচল করতে না পেরে বাড়ির উঠানেও পানি উঠে জমে থাকে। ’

গ্রামের বাসিন্দা ও হানিফ পরিবহনের চালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘ওই সচিব গ্রামের বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম দিয়ে অংশীদারদের দু-এক শতক জায়গা কেনেন। পরে হয়রানি করে শরিকদের পুরো জমি বেচতে বাধ্য করেন। জমি না বেচলে তিনি মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেন। ’

শরিফুল ইসলামের স্ত্রী শাহিদা বেগম বলেন, ‘বাড়ির পাশে ঘর তুলে চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদ করায় আমার বিরুদ্ধে তিনটি মিথ্যা মামলা করেছেন। আমরা গরিব মানুষ। প্রতিনিয়ত আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছি। এ ছাড়া আমার শিশুকন্যার বিরুদ্ধেও তিনি থানায় জিডি করেছেন। ’

মৃত কাজিম উদ্দিনের মেয়ে চম্পা খাতুন জানান, একসময় তাঁরা জ্বালানি হিসেবে বাগানের পাতা কুড়িয়ে রান্নাবান্না করতেন। কিন্তু বারী মৃধা জায়গা কেনার পর তিনি কাউকে বাগানে প্রবেশ করতে দেন না। বাগান থেকে পাতা কুড়ানোর কারণে তাঁকে জেল খাটানো হয়েছে।

গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদের ছেলে মাসুদ রানা বলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে দেওয়াল তুলে দিয়েছেন তিনি। এ কারণে পুরো এলাকা জলমগ্ন হয়ে থাকে। ’

সমাজসেবা কার্যালয়ে কর্মরত কামাল জানান, তিনি কর্মস্থলে থাকার পরও তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছেন। এমনকি পৈতৃক জমিতে ঘর তোলার সময় বাধা দিয়েছেন।

আব্দুল খালেকের ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, জমি না বেচায় তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করা হয়েছে। জমি বেচলে মামলা তুলে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন।

সরকারি খাসজমিতে বাস করা মঞ্জুর স্ত্রী হাসনা জানান, তাঁদের জায়গা থেকে উচ্ছেদ করতে চক্রান্ত করছেন সাবেক সচিব। মৃত মাসহ তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ওই মামলায় তাঁকে নিয়মিত হাজিরা দিতে হয়।

আব্দুল আজিজের ছেলে সজল আহমেদ বলেন, ‘ওই সচিবের কাজ মানুষের জমিতে বাউন্ডারি দিয়ে তাঁকে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা। তিনি আমার মামা নূরুল ইসলামের ২০ বছর আগে কেনা মেহগনি বাগানের চারপাশে বেড়া ও দেয়াল তুলে দিয়ে যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছেন। এ ছাড়া জমির পাশে গর্ত করে ড্রেন করে চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। ’

মৃত বাছের মণ্ডলের ছেলে দেছের আলী বলেন, সচিবের ভাতিজা নাদিম মৃধা কৃষিজমিতে পুকুর কেটে মানুষের জমি ও বাড়িতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছেন। প্রতিবাদ করায় মামলা দিয়েছেন।

মৃধার ভাগ্নে সামাদ পিন্টু বলেন, ‘মামা মুখে ভালো ভালো কথা বললেও আসলে তিনি দুর্নীতিবাজ। তিনি মায়ের জমি দখল করছেন। এ ছাড়া উপকারের অজুহাতে সাত লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ’

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নুরুন্নবী ওরফে বারী মৃধা বলেন, ‘অবসরে যাওয়ার পর এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য একটা বোটানিক্যাল গার্ডেন তৈরির কাজ করছি। কাউকে হয়রানি বা নির্যাতন করিনি। গ্রামের মানুষ আমার কাজে বাধা দিয়েছে, হয়রানি করেছে। ’ তবে গ্রামের মানুষ তার সঙ্গে না থেকে কেনই বা বিপক্ষে অবস্থান নিল? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দু-একজনের ইন্ধনে হুজুগে গ্রামবাসী লাফাচ্ছে। ’

এ বিষয়ে নাটোর থানার পরিদর্শক কাজী জালাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুন্নবী বিভিন্ন সময় থানায় অভিযোগ নিয়ে এসেছেন। কিন্তু সেগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়নি। তিনি একজন গণবিচ্ছিন্ন মানুষ। এ কারণে থানায় এসে কোনো মামলা করতে না পেরে আদালতে মামলা করছেন। ’

নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আকরামুল হোসেন বলেন, ‘ওই গ্রামে গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা সাবেক অতিরিক্ত সচিবের বিরুদ্ধে নানা হয়রানির অভিযোগ করেছেন। ’

watch price in bangladesh

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here