ফ্রিডম পার্টির ক্যাডার থেকে যেভাবে যুবলীগে উত্থান খালেদ মাহমুদের

0
51

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ওরফে ল্যাংড়া খালেদকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। বুধবার সন্ধ্যায় তাকে তার গুলশানের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
এর আগে খালেদের গুলশান-২ এর ৫৯ নম্বর রোডের ৫ নম্বর বাসায় শুরু হয় অভিযান। দুপুর থেকেই বাড়িটি ঘিরে রাখে র‌্যাবের শতাধিক সদস্য। একই সময় ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাবে ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‌্যাব। এই ক্যাসিনোর সভাপতি খালেদ।

এ সময় ক্যাসিনোর ভেতর থেকে তরুণীসহ ১৪২ জনকে আটক করা হয়। সেখানে নগদ ২০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, মদ, বিয়ার জব্দ করা হয়।

জানা গেছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবার সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তার হাতে হত্যার শিকার হন। হত্যাকারী কিছু কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে লে. কর্নেল) খন্দকার আব্দুর রশিদ, কর্নেল সাঈদ ফারুক রহমান ও মেজর বজলুল হুদা পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশ ফ্রিডম পার্টি দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৭ সালে ফ্রিডম পার্টির মানিক, মুরাদের হাত ধরেই খালেদের রাজনৈতিক উত্থান।

১৯৮৯ সালে ফ্রিডম পার্টি ক্যাডাররা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে যে হামলা করে তাতে খালেদ ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত রিপণ অংশগ্রহণ করেছিল। উক্ত হামলায় অভিযুক্তের প্রাথমিক তালিকায় তার নাম থাকলেও ঠিকানা উল্লেখ না থাকার সুযোগে বিএনপি পন্থি আইনজীবী পিতা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তার নাম বাদ দেয়ান।

১৯৯১ সালে মানিক মুরাদের নেতৃত্বে জামায়াত নেতা আব্বাস আলী খানের নির্বাচন করেছিল। সে সময় তাদেরকে জামায়াতের পক্ষ থেকে ওয়াকিটকিও দেয়া হয়েছিল। শান্তিনগরের হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে ভর্তির পর তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে পুলিশের সঙ্গে তার সংঘর্ষ বাধে। পুলিশের গুলিতে তার একটি পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই থেকেই তাকে ল্যাংড়া খালেদ নামে অনেকে চেনে।

পরবর্তিতে বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাসের ভাই মির্জা খোকনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হন খালেদ। তখন তিনি তার মায়ের নামও খালেদা এমন মন্তব্য করে সহানুভূতি নেয়ার চেষ্টা করতো। তবে ফ্রিডম পার্টির সঙ্গে বিএনপির অলিখিত সমঝোতা থাকার কারণে তাকে বিএনপি বা এর কোনো অঙ্গ সংগঠনে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন হয় নি। ১৯৯৪ সালের মেয়র নির্বাচনে মির্জা খোকনের নির্দেশে খালেদ ও যুবদল নেতা মজনু খিলগাঁও রেলওয়ে কলোনী থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আসা আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ ও তার কর্মীদের অস্ত্রের মুখে বের করে দেন। মির্জা খোকনের সহযোগিতায় খালেদ মালয়শিয়ায় সেকেন্ড হোমের অনুমতি পান। প্রতি মাসে মির্জা খোকনের জন্য টাকা পাঠাতো খালেদ। এছাড়া যুবদলের সন্ত্রাসী মজনুর সকল রাজনৈতিক কার্যক্রমের ব্যয় বহন করে আসছে খালেদ।

২০১০ সালে খালেদ যুবলীগ নেতা পরিচয় দেয়া শুরু করেন। এ পরিচয়ে খিলগাঁও বাজার কমিটির সভাপতি হন। যুবলীগে প্রথমে তাকে শাহজাহানপুর থানা শাখার সভাপতি পদ দেয়ার কথা ছিল, কিন্তু সে মহানগরের সাংগঠনিক দাবি করে। শোনা যায়, এ পদ লাভে পলাতক এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সুপারিশ ছিল। ২০১৩ সালে মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের কমিটি ঘোষণার সময় নিজের নাম তমু বলে পরিচয় দিতেন। অন্যদিকে একের পর এক মামলা থেকে রেহাই পাওয়া শুরু করেন।

ভারতে পলাতক বিএনপিপন্থী পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করার পর যুবলীগের পদ পেয়ে খিলগাঁও ও শাহজাহানপুরে মানিকের স্থলাভিষিক্ত হন। সেই সম্পর্কে ভাঙন ধরার পর তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে দুবাইয়ে পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে। তার সহযোগিতা নিয়ে টেন্ডারবাজিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেন খালেদ। সেই টাকার ভাগ নিয়মিত পৌঁছে যেত জিসানের কাছে। ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’ খালেদের অবস্থান প্রমাণে সিঙ্গাপুরের অভিজাত হোটেল মেরিনা বে’র সুইমিংপুলে জিসান ও খালেদের সাঁতার কাটার ছবি দিয়ে ছাপানো পোস্টারে ছেয়ে যায় নগরী।

যুবলীগের এক নেতাকে সরিয়ে দিতে একে-২২ রাইফেলসহ ভারী আগ্নেয়াস্ত্রও এনেছিলেন খালেদ। এসব অস্ত্র পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ উদ্ধার করে। জিসানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলেও আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী নবী উল্লাহ নবীর সঙ্গেও রয়েছে খালেদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। গত সপ্তাহে দু’জনের মধ্যে বৈঠকও হয়েছে।

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। মতিঝিল-ফকিরাপুল ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো, ফুটপাতের টাকা থেকে শুরু করে কমপক্ষে সাতটি সরকারি ভবনে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি জমি দখলের মতো নানা অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগের দুর্দিনের নেতা সোহেল শাহরিয়ারের মত অনেকেই খালেদের ভয়ে এলাকা ছাড়া হয়েছেন, কেউ বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে শান্তিনগর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের মায়ের উপরও গুলি করিয়েছে খালেদ যা বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছিল।

এছাড়া মোহাম্মদপুরে ঢাকা মহানগর উত্তরে সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন বাবু ওরফে লীগ বাবু হত্যা, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কাউসার হত্যা, খিলগাঁও এ বাবার সামনে ছেলে হত্যা সহ বেশ কয়েকটি খুনের সঙ্গে খালেদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

এ প্রসঙ্গে এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বলেন, যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী খালেদের প্রসঙ্গে হয়তো নাও জানতে পারেন। কিন্তু ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট কি খালেদের অতীত-বর্তমান জানেন না? দুঃসময়ের কর্মি ও শ্রেষ্ঠ সংগঠক হিসেবে আখ্যা পেয়ে যদি খালেদের পক্ষে সাফাই দেন তাহলে সেটা হবে নীতি ও আদর্শের সঙ্গে প্রতারণা। যার বা যাদের জানা দরকার তিনি ও তারা কাগজে কলমেই সত্যতা জানেন। এবার গ্রেফতার না হলে খালেদের মহানগর যুবলীগের সভাপতি হওয়া প্রায় নিশ্চিত ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে দলে স্থান দেয়ার আগে একবারের জন্যও কি ভাবেন নি যে, খালেদরা নেত্রীর জীবনের জন্যও হুমকি হতে পারে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here