গোপালগঞ্জের ভিসিনামা!

0
28

‘অধ্যাপক আবু জুনায়েদ স্থির করেছেন,উপাচার্যের চাকরির মেয়াদ ফুরোলে তিনি দুধের ব্যবসা করবেন। তিনি হিসেব করে দেখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার চাইতে গাভী পুষে গয়ালগিরি করা অনেক লাভজনক। কিছুদিন বাদেই নিউজপ্রিন্টে ছাপা একটি লিফলেট হাতে হাতে তামাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছড়িয়ে গেল। লিফলেটের শিরোনাম দেয়া হয়েছে- ‘উপাচার্য না গো আচার্য’!

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কাজেকর্ম নিয়ে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফার ‘গাভী বৃত্তান্ত’র এসব মুখরোচক লেখা সামনে চলে আসছে। বিশেষত গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দিন একের পর এক কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হবে আহমদ ছফা হয়তো গাভী বৃত্তান্ত তাকে নিয়ে লিখেছেন।

গোপালগঞ্জের এই ভিসির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও অনুযোগের শেষ নেই। নিয়োগ দুর্নীতি,ভর্তি বাণিজ্য, প্রকল্প দুর্নীতি, বিউটি পার্লার ব্যবসা, গোবর ব্যবসা, শিক্ষার্থী বহিষ্কার ইত্যাদি অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এতো কিছুর পরও তিনি পদ টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর! সর্বশেষ নিজের পদ বাঁচাতে ‘বহিরাগত গুণ্ডাদের’ দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষার্থী বহিস্কার করে পিতৃশাসনের দাবি

‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?’ পত্রিকায় মন্তব্য প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য এই প্রশ্নটি ফেসবুকে  লিখেছিলেন গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরবিপ্রবি) আইন বিভাগের ছাত্রী ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া। এই স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করেই ক্ষেপে যান ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দিন। তিনি ওই ছাত্রীকে শুনিয়ে দিয়েছেন কুরুচিপূর্ণ সব কথা, যা ভাইরাল হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।  ডেইলি সানের ক্যাম্পাস প্রতিবেদকের সঙ্গে ভিসির কথোপোকথনের এক পর্যায়ে ভিসি বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী, তা তোর আব্বার কাছে শুনিস! গেছে কোনদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে? এটাতো(ল ডিপার্টমেন্ট) আমি খুলছিলাম বলেই তো তোর চান্স হইছে, নইলে তুই রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়াতি। বেয়াদব ছেলে-মেয়ে। তিন দিনের বাচ্ছুর(বাছুর) তুই আবার (জানতে চাস) বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী’!

এরপরে ঘটনার জেরে, জিনিয়ার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে তাকে সাময়িক বহিস্কার করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তখনই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। ভিসির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে ভিন্ন কথা বলেন, “সন্তান তার বাবার সঙ্গে বেয়াদবির ভাষায় কথা বলবে এবং সেই সন্তানের ভাষা পরিবর্তন করতে বাবা সন্তানকে শাসন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সন্তান যদি কারো প্ররোচনায় বাবার কথা রেকর্ড করে সেটিকে অশালীন ভাষা মনে করে ফেসবুকে প্রচার করে এটা তার ব্যাপার। সংসার চালাতে শাসন করবো। আবার আদর করবো-এটাই তো স্বাভাবিক”!

এরপরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিসির বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যানসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ভিসি বরাবর জিনিয়ার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার চেয়ে একটি লিখিত আবেদন করেন। ভিসি বহিষ্কারাদেশ তুলে নেন। তবে ভিসির পদত্যাগের দাবিতে জোর আন্দোলন গড়ে তোলেন শিক্ষার্থীরা।

আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম

ভিসির বিরুদ্ধে এরআগে নানা আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার আমলে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে এমএলএসএস পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে এসএসসি বা সমমানের পাসের কথা বলা হলেও অষ্টম শ্রেণী পাস প্রার্থীদেরও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী পদে শিক্ষাজীবনে তৃতীয় বিভাগ বা ২ দশমিক ৫০ গ্রেডের প্রার্থীদেরও নিয়োগ প্রদান করেছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়োগবিধির পরিপন্থী। অথচ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ন্যূনতম যোগ্যতা লেখা ছিল দ্বিতীয় বিভাগ। ভিসির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপন প্রকল্পের (অব্যয়িত) প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করা। প্রায় ২ কোটি টাকার অধিক মূল্যের বই ক্রয় এবং দুই থেকে তিনগুণ অধিক মূল্যে কোটি টাকার বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ক্রয়।

ভর্তি বাণিজ্যে জড়িত ভিসি

ভর্তি বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ‘ভিসি কোটা’র নামে তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে ফার্মেসি বিভাগ, আইন বিভাগ ও বায়ো টেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি করানোর অভিযোগ রয়েছে।  বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ফার্মেসি বিভাগে মেধাক্রম ২০৮৪ নিয়েও ভর্তি হয়েছেন মারিয়া খানম নামের এক শিক্ষার্থী। ১৩৩৩ মেধাক্রম নিয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ওবায়দুর রহমান নামে একজন ছাত্র। অথচ এসব বিভাগে এক থেকে ১৫০ জন ছাত্রের বেশি ভর্তি হওয়ার কথা নয়। এর বাইরে বায়ো টেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেও ভর্তি হয়েছেন মো. আকাশ নামে এক শিক্ষার্থী। ‘ভিসি কোটা’র নামে অনেক বিভাগে বিধিবহির্ভূতভাবে আরও অনেক শিক্ষার্থী ভর্তির অভিযোগ রয়েছে।

দেশের প্রথম বিউটি পার্লার ব্যবসায়ী ভিসি

ভিসি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নিজের বাংলোয় সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও একটি বিউটি পার্লার খুলে বসেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যে বিউটি পার্লার ভিসি নিজে দেখভাল করেন। দেশের এক গণমাধ্যমের সংবাদের অনুসন্ধানে ভিসি নিজে বিউটি পার্লারের সিরিয়াল মেনটেন করার একটি ছবি প্রকাশিত হতে দেখা যায়, যা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ট্রল হয়েছে।

দেশের প্রথম গোবর ব্যবসায়ী ভিসি
ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দিন উদ্ভিদের পরিচর্যার নামে প্রায় কোটি টাকার গোবর বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।  শিক্ষার্থীরা গণমাধ্যমে অভিযোগ করে বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়বাংলা চত্বরের বিপরীত পাশে গোবর স্তুপ করে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এখানে গোবর স্তুপ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দপ্তরের সেকশন অফিসার নিজামুল হক চৌধুরীর মাধ্যমে বড় অঙ্কের টাকার গোবর ক্রয় করা হয়েছে। কর্মীরা টাকার অঙ্ক বলতে না পারলেও এটুকু নিশ্চিত করেছেন যে, টাকার পরিমাণ প্রায় কোটির কাছাকাছি।

খোন্দকার নাসিরউদ্দিন মূলত উদ্ভিদ গবেষক। এর আগে তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ এর বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মূলত সেই সূত্রেই গাছের সঙ্গে তার সখ্যতা বলে কথিত আছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বশেমুরবিপ্রবিতে যেখানে বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নটা বেশি দরকার ছিল, সেখানে তিনি গাছ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন বেশি। আর এ কারণেই খাতটিতে বছরের পর বছর লাখ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন আর অভিযোগ রয়েছে, ব্যয় দেখিয়ে লোপাট করেছেন মোটা অঙ্কের টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হলেও ২০১৭ সালের ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গবেষণায় ব্যায় করা হয় মাত্র ১০ লক্ষ টাকা। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় গুরুত্ব প্রদান করা উচিত সেখানে গবেষণায় অর্থ ব্যয় না করে গোবরে অর্থ ব্যয় করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষার্থীরা। জানা যায়, প্রতি সপ্তাহেই বিশ্ববিদ্যালয়ে গোবর নিয়ে কয়েকটি গাড়ি প্রবেশ করে। গোবর ক্রয়ে বরাদ্দ নাকি প্রায় কোটি টাকা!

বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক, সাবেক ছাত্রদল নেতা
খোন্দকার নাসির উদ্দিন ছিলেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত শিক্ষক প্যানেল সোনালি দলের সাবেক এ যুগ্ম সম্পাদক।   জানা যায়, তিনি ছাত্রদলের যুক্তরাজ্য শাখার সাবেক নেতা। যদিও এগুলো তিনি অস্বীকার করে আসছেন।

বহিরাগতদের লেলিয়ে দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা
ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দিন সর্বশেষ অস্ত্রধারী ‘বহিরাগত গুণ্ডা বাহিনী’ লেলিয়ে দিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মমভাবে হামলার নির্দেশ প্রদান করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শনিবার বেলা ১১টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ হামলায় অন্তত ২০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

ঘটনার জেরে, আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।  নিদের্শনায় বলা হয়, আজ রাত ৮টার মধ্যে সব ছাত্রী ও রোববার সকাল ১০টার মধ্যে সব ছাত্রদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ নির্দেশ উপেক্ষা করে ভিসির পদত্যাগের দাবিতে ক্যাম্পাসের বাইরে আন্দোলন করতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাদের ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে।  হামলায় আহতের কয়েকজনকে গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।  তবে ভিসি এই হামলার কথা অস্বীকার করেছেন। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা নিয়ে  তিনি বলেন, ছাত্ররা আমার সন্তানের মতো। তাদের ওপর লোক ভাড়া করে হামলা কেন চালাবো?’

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর প্রক্টরিয়াল দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামবাসীকে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদের উপর।  এ অবস্থায় নৈতিক কারণেই আমি পদত্যাগ করেছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here