পাকিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অজানা কাহিনী

0
58

যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের হামলা অর্থাৎ, ৯/১১’র পর পাকিস্তানে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং জঙ্গিদলগুলোর এই হত্যা ও নিপীড়নের চিত্র এতদিন লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল।

সম্প্রতি বিবিসি পাকিস্তানের ওইসব অঞ্চলের কয়েকটি জায়গায় প্রবেশ করে এ ভয়াবহতার শিকার লোকজনদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে। আর তা থেকেই উঠে এসেছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব অজানা কাহিনী।

২০১৪ সালের শুরুর দিকে বিশ্বজুড়ে টিভি চ্যানেলগুলোতে পাকিস্তানি তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বড় জয় পাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। খবরে রাতের বেলা বিমান হামলায় তালেবানের শীর্ষ নেতাদের একজনকে হত্যা করার দাবি করা হয়।

বলা হয়, আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী নর্থ ওয়াজিরিস্তানে আদিবাসীদের এলাকায় রাতভর বোমা হামলায় আদনান রশিদ এবং তার পরিবারের পাঁচজনের বেশি সদস্য নিহত হয়েছে।

পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক টেকনিশিয়ান আদানান বেশ পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের জঙ্গি কমান্ডার। ২০১২ সালে পাকিস্তানের স্কুলশিক্ষার্থী মালালা ইউসুফজাইকে তালেবান বন্দুকধারীরা গুলি করে। মালালা পাকিস্তানে মেয়ে শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে কাজ করছিলেন বলে তাকে হত্যার চেষ্টা করে তালেবান।

মালালাকে লেখা এক চিঠিতে আদনান এই হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে আদনান কারাভোগও করেন।

সেনা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি নিউজ চ্যানেলগুলোতে বলা হয়েছিল, হামজনি এলাকায় দুইদিন আগে আদনান রশিদ যে বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন সেখানে জঙ্গিবিমান থেকে বোমা বর্ষণ করা হয়েছে।

ওয়াজিরিস্তান এবং পাকিস্তানের দুর্গম অন্যান্য পাহাড়ি অঞ্চলগুলো সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং ৯/১১ হামলার পর প্রতিবেশী আফগানিস্তানেও মার্কিন সেনাদের অভিযান শুরু হয়। তারপর থেকেই পাকিস্তানের সেনারা ওইসব অঞ্চলে বহিরাগতদের যাতায়াতের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সীমান্ত গলে তালেবান যোদ্ধা, আল-কায়দা জঙ্গি এবং অন্যান্য জঙ্গিদের পাকিস্তানে আত্মগোপন রোধে তারা এটা করেছিল বলে দাবি করা হয়।

পেশাওয়ার এবং অন্যান্যা জায়গায় এমন শরণার্থী ক্যাম্পে অনেকে আশ্রয় নিয়েছে। ছবি: বিবিসি
পেশাওয়ার এবং অন্যান্যা জায়গায় এমন শরণার্থী ক্যাম্পে অনেকে আশ্রয় নিয়েছে।

এমনকি সাংবাদিকদেরও ওইসব এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হত না। যে কারণে সেনাবাহিনী থেকে দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের কোনো উপায় ছিল না। তবে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর দেওয়া ওই তথ্য ভুল বলে প্রমাণিত হয়। আদনান নিহত হওয়ার খবর প্রকাশের প্রায় বছর খানেক পর খোদ আদনান একটি ভিডিওতে হাজির হয়ে তার জীবিত থাকার প্রমাণ দেন।
তারপরই জানা যায়, শীর্ষ জঙ্গি কমান্ডার আদনান ও তার পরিবারের উপর নয় বরং স্থানীয় এক বেসামরিক ব্যক্তির বাড়ি লক্ষ্য করে বিমান হামলা হয়েছিল এবং সেনাবাহিনী কখনোই তাদের এই ভুলের কথা কাউকে জানতে দেয়নি।

সম্প্রতি বিবিসি’র একটি দল সিন্ধু নদীর তীরের ছোট্ট শহর দার ইসমাইল খানের বাসিন্দা হতভাগা ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে। এই শহর হয়েই খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেতে হয়। আদিবাসীদের ওই এলাকায় সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ।

ওই ব্যক্তির নাম নাজিরুল্লাহ, হামলার সময় তার বয়স ছিল ২০ বছর।তিনি বলেন, “খাতেই কালাই গ্রামে আমাদের দুই কক্ষের একটি বাড়ি ছিল। আমার তখন সদ্য বিয়ে হয়েছে। বাড়ির একটি কক্ষে আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে ছিলাম। অন্য কক্ষে পরিবারের বাকি সদস্যরা ঘুমিয়ে ছিল।”

“বাড়িতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণে আমার ও আমার স্ত্রীর ঘুম ভেঙে যায়। বারুদের তীব্র গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে গিয়েছিল। আমরা দুজনই হুড়মুড় করে দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে ছুটতে থাকি। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম আমাদের বাড়ির পুরো ছাদ ধসে পড়েছে। শুধু আমাদের খাট যেখানে ছিল সেই জায়গার উপরের কিছু অংশ ঝুলে আছে। দ্বিতীয় কক্ষের উপরের পুরো ছাদ ধসে পড়েছে এবং পুরো বাড়িতে আগুন জ্বলছে।”

ধ্বংসস্তুপ থেকে কান্নার আওয়াজ পেয়ে নাজিরুল্লাহ ও তার স্ত্রী পরিবারের সদস্যদের বাঁচাতে এগিয়ে যান। পরে প্রতিবেশীরাও তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে।

ওই রাতে নাজিরুল্লাহর পরিবারের চার সদস্য মারা যায়। ধ্বংসস্তুপ থেকে তার একবছর বয়সের ভাতিজিসহ আরো চারজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। যদিও তারা গুরুতর আহত ছিল।

ওই হামলার পর নাজিরুল্লাহ পরিবার নিয়ে দার ইসমাইল খান শহরে চলে যান। গত দুই দশক ধরে পাকিস্তানের আদিবাসী অনেক পরিবারকে যুদ্ধ-সংঘাত থেকে জীবন বাঁচাতে একবার নয় বরং কয়েকবার বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে।

ওয়াজিরিস্তানের বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায় সেনা অভিযানের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে।
ওয়াজিরিস্তানের বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায় সেনা অভিযানের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে।

প্রশাসন এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষক দলের তথ্যানুযায়ী, ২০০২ সাল থেকে জঙ্গি দলগুলোর হামলার কারণে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ৫০ লাখের বেশি মানুষকে বাড়ি ঘর ছেড়ে সরকারি শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিতে বা অপেক্ষাকৃত শান্ত এলাকায় বাড়ি ভাড়া করতে বাধ্য হতে হয়েছে।
এই সময়ে কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে তার আনুষ্ঠানিক কোনো সংখ্যা জানা যায়নি। তবে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজকর্মীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী বেসামরিক নাগরিক, জঙ্গি এবং সেনাসদস্য মিলিয়ে সংখ্যায় তা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

স্থানীয় সমাজকর্মীদের মতে, বেশির ভাগ বেসামরিক নাগরিক সেনাবাহিনীর বিমান হামলা এবং সেনা অভিযানে নিহত হয়েছে। এ দাবির পক্ষে তারা বেশ কিছু ভিডিও ও তথ্যচিত্র সংগ্রহ করেছে বলে জানায় বিবিসি।

গত বছরের ‍শুরুর দিকে ওই সব অঞ্চলের বেসামরিক নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় নতুন একটি আন্দোলন শুরু হয়। ওই আন্দোলন ‘পাশতুন তাহাফুজ মুভমেন্ট’ (পিটিএম) নামে পরিচিত।

পিটিএম আন্দোলনকারীরা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের আদিবাসীদের নিপীড়ন এবং সেনা অভিযানের শিকার হওয়ার কাহিনী তুলে ধরতে শুরু করেছে।

অসহায় ওই মানুষগুলো এতদিন ভয়ে মুখ বন্ধ রাখেছিল।

পিটিএম নেতা মনজুর পাশতিন বলেন, “নিজেদের নিপীড়ন এবং অপমান নিয়ে মুখ খোলার সাহস জোগাড় করতে তাদের প্রায় ১৫ বছর সময় লেগে গেছে। সেনাবাহিনী অভিযানের নামে কিভাবে তাদের সাংবিধানিক অধিকার লুণ্ঠন করছে এবং জঙ্গিদের সমর্থন দেওয়ার নীতিকে সমর্থন করছে সে বিষয়ে আদিবাসীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে।”

আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পিটিএম এখন নিজেরাই হুমকির মুখে বলে জানান তিনি। বলেন, গত ২৬ মে নর্থ ওয়াজিরিস্তানে তাদের বিক্ষোভ চলাকালে সেনাবাহিনী সরাসরি গুলি চালিয়ে পিটিএম’র ১৩ সদস্যকে হত্যা করে।

অন্যদিকে সেনাবাহিনীর দাবি, তাদের একটি চেকপোস্টে হামলা হলে তারা তিন আন্দোলনকারীকে গুলি করে।

পিটিএম অভিযোগ তুলেছে এমন কয়েকটি ঘটনা বিবিসি স্বাধীনভাবে তদন্ত করে দেখেছে। বিবিসি থেকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্রকে ঘটনাগুলো জানানো হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করে বলেন, ওই সব অভিযোগ ‘অনেক বেশি একতরফা’।

পাকিস্তানের শাসকদের চরিত্র পাল্টায়নি। ওরা দীর্ঘ সময় বাঙালিদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে। বেলুচিস্তানের মানুষের ওপর তাদের নিপীড়ন এখনো চলছে।

১৯৪৭ সালের ৫ আগস্ট ‘খান অব কালাত’ মীর আহমেদ ইয়ার খান আহমেদজাই বালুচ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৪৮ সালের মার্চে সেই স্বাধীনতার অবসান হয় পাকিস্তানি বাহিনীর আগ্রাসনে। এরপর থেকেই সেখানে চলছে মুক্তিকামী মানুষের লড়াই। এখনও বেলুচিস্তানে প্রতিদিন অগ্নিসংযোগ, গুম, হত্যা, ধর্ষণ হয় ‘যেসব ভয়াবহ নিপীড়ন এখনো চলেছে, এই নিপীড়ন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।’

এ পর্যন্ত ২৫ হাজারের বেশি তরুণ বালুচ নিখোঁজ । স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলায় এসব তরুণ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর রোষানলে পড়েছে।

বেলুচিস্তানে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর নিপীড়নের নানান বর্ণনা দেন মীর সুলেমান দাউদ জান আহমেদজাই। তিনি বলেন, পাকিস্তানে দুটি ‘জঙ্গিগোষ্ঠী’ আছে। একটি সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া দেশটির সামরিক বাহিনী এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। অন্যটি হাক্কানি নেটওয়ার্ক, লস্কর-ই-তাইয়েবার মতো উর্দিহীন জঙ্গিগোষ্ঠী। এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠীকে সহায়তা করে। ‘খান অব কালাত’ বলেন, বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে পাকিস্তান। ম্যানিলা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া—যেখানেই সন্ত্রাস হোক, সেখানে পাকিস্তানের সহযোগিতা আছে।

বিবিসি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সরকারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারাও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। যদিও বিরোধী দলে থাকার সময় ইমরান খান অনেকবারই অদিবাসীদের অধিকার লঙ্ঘন নিয়ে আওয়াজ তুলেছিলেন।

watch price in bangladesh

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here