হার না মানা নতুন লড়াইয়ে সৌদি ফেরত সাত নারী

0
48

আরও অনেক নারীর মতো তারাও বিদেশে গিয়ে ভাগ্য ফেরানোর স্বপ্ন দেখিছিলেন। সেই স্বপ্ন একসময় পরিণত হয় তিক্ত অভিজ্ঞতায়। ফিরতে হয় তাদের দেশে। কিন্তু তারা হাল ছেড়ে দেননি। বরং সাতজন মিলে শুরু করেছেন নতুন এক স্বপ্ন। গড়ে তুলেছেন ধ্রুবতারা নামে একটি ক্যাটারিং সার্ভিস। নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিদেশ ফেরত সব মানুষদের তারা ধ্রূবতারার মত পথ দেখাতে চান। 

এই সাত নারীর গল্পটা মোটামুটি একইরকম। পরিবার পরিজন নিয়ে একটু ভালো থাকার আশায় আর সন্তানদের সুন্দর জীবন ও ভবিষ্যত্বের কথা চিন্তা করে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্রবাসে। কিন্তু নিয়োগকর্তার নানা নির্যাতন-বঞ্চনা ও দাসত্ব তাদেরকে দিয়েছে বিভীষিকাময় জীবন।

পরে গত বছরের বিভিন্ন সময়ে তারা দেশে ফেরত আসেন। এদের মধ্যে একজনকে দেশে ফিরতে হয়েছে অন্তঃসত্বা হয়ে। জন্ম নেয় তার একটি কন্যা সন্তান। কি পরিচয়ে বড় হবে সেই নিস্পাপ শিশু জানেন না মা।

পঙ্গু জীবণের কারণে স্বামীর সংসারে আর ঠাঁই হয়নি আরেকজনের। দেশে ফিরে পরিবার ও সমাজের কাছে হারিয়েছেন তাদের গ্রহনযোগ্যাতা। হতাশা আর দুঃচিন্তা যেন তার পিছু ছাড়ে না।

নির্যাতনের শিকার এই নারীদের দেশে ফেরত আনতে আবেদন তৈরি ও মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানোর কাজে সহায়তা করেছিল বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। দেশে ফিরে বিমানবন্দরে নেমেই তাদের কথা হয় ব্র্যাক মাইগ্রেশ প্রোগ্রামের কর্মীদের সাথে। বিমানবন্দরে দেওয়া হয় জরুরী সহায়তাসহ বিভিন্ন তথ্য।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ধারাবাহিক কাউন্সিলিংয়ের পর এই নারীরা জানান তারা কিছু একটা করতে চান। তারা জানায় তারা রান্না-বান্নার কাজ ভালো পারেন। এদের মধ্যে একজন আবার ব্যবস্থাপনায় ভালো। আমরা তখন প্রত্যেকের জন্য ৬৫ হাজার টাকা বরাদ্দ করি। ছয়জনের জন্য পুঁজি ঠিক করা হয় তিন লাখ ৯০ হাজার টাকা। শুরু করেন নতুন লড়াই। তারা যৌথ উদ্যোগে তৈরি করেন ‘ধ্রূবতারা ক্যাটারিং সার্ভিস’ এরপরের গল্পটা শুধুই এগিয়ে যাবার। এই সাতজন ঢাকার দক্ষিণখানে একটা বাসা ভাড়া নিয়েছেন। সেখানে তারা নিজেরাই ঘরোয়া পরিবেশে খাবার রান্না করেন। এরপর বনানী, খিলক্ষেত, উত্তরা, বিমানবন্দরসহ আশপাশের বিভিন্ন অফিস, স্কুল, কলেজে কিংবা মার্কেটে দুপুরের খাবার পৌঁছে দেন তারা। এছাড়া যেকোন অনুষ্ঠানের জন্য চাহিদা অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করছেন নিজেরাই।

তারা কাজ ভাগ করে নিয়েছেন নিজেদের মধ্যে। এদের মধ্যে একজন লেখাপড়া ও ইংরেজি জানেন। তিনি বিভিন্ন অফিসে গিয়ে আগের দিন অর্ডার নেন। সে অনুযায়ী প্রথমে বাজার ও রান্না হয়। এরপর বক্সে করে তারা খাবার পৌঁছে দেন। এই কাজে তাদের সহায়তা করেন ব্র্যাকের একজন স্বেচ্ছাসেবী।

ধ্রবতারা ক্যাটারিং এর ম্যানেজর হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করছেন ডালিয়া আক্তার।

তিনি বলেন, আমি যখন নিয়োগকর্তার নির্যাতনে পঙ্গু হয়ে দেশে ফেরত আসি তখন আমার স্বামী আর আমাকে গ্রহণ করেনি। আমি এতিম, ছোট বেলাতেই আমি আমার মা-বাবাকে হারিয়েছি, উঠেছিলাম বোনের বাসায়। তারও স্বামী নেই। বোন একটি গার্মেনটন্সে কাজ করেন, তার কাছে আমি আরেকটি বোঝা। এমন সময় ধ্রুবতারার আপারা আমাকে বুকে টেনে নিয়েছেন। তারা বলেছেন তুমি যেহেতু লেখাপড়া জানো তুমি আমাদের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করবে। আমরা তোমার দেখাশোনা করব। থাকা-খাওয়াসহ মাস শেষে বেতনও দিবো। তাদের এমন মানবিক আশ্রয় পেয়ে আমিও এখন স্বপ্ন দেখি।

ধ্রুবতারা শুরুর পর এই নারীদের পরিবার ও সমাজে তৈরি হয়েছে গ্রহণযোগ্যতা, বেড়েছে মর্যাদা। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সকলে চালু করেছেন একটি করে ‘বীমা’। আর তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের নীট মুনাফা থেকে শতকরা দুই শতাংশ তাদের মত পরিস্থিতির শিকার হয়ে দেশে ফেরা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করবেন।

এই নারীরা বলেন, মানব পাচারকারী ও অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সিদের খপ্পরে পরে যেন আমাদের মত আর কারো ভাগ্যে এমনটা না ঘটে। আর এখন আমরা আবার স্বপ্ন দেখছি ঘুরে দাঁড়ানোর। আমরা বড় প্রতিষ্ঠান করতে চাই। যেখানে আমাদের মত ভাগ্যবরণকারী নারীদের আশ্রয়স্থল গড়তে চাই।

watch price in bangladesh

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here