রেজাল্ট হল আগে, খাতা কাটা হল পরে— চট্টগ্রাম রেলে অবাক কাণ্ড!

0
68

তড়িঘড়ি বিল দিয়ে ১৯ লাখ টাকা মেরে খাওয়াই ছিল উদ্দেশ্য

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ৩২ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ নিতে এসেছিলেন চট্টগ্রামে থাকা রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমিতে (আরটিএ)। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয় পরীক্ষা। নিয়ম অনুযায়ী ওই পরীক্ষার খাতা কেটে প্রশিক্ষণার্থীদের দেওয়ার কথা সনদ। কিন্তু ট্রেনিং একাডেমি তাদের কাছ থেকে নেওয়া পরীক্ষার খাতা কাটেনি। খাতা না কেটে তাদের উত্তীর্ণ ঘোষণা করে দেয়।

বাংলাদেশ রেলওয়ের একমাত্র এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অবস্থান চট্টগ্রামে হালিশহর এলাকায়। রেলওয়ে সংক্রান্ত যাবতীয় প্রশিক্ষণ এখানেই দেওয়া হয়।

shopping bag home delivery

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ৩২ কর্মকর্তা ২০১৮ সালে এখানে প্রশিক্ষণ নেন। ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তারা আরটিএতে। অভিযোগ উঠেছে, ৩২ কর্মকর্তাকে দেড় মাস প্রশিক্ষণের পর কোর্স কোঅর্ডিনেটর আবুল কাসেম তাদের পরীক্ষার খাতা নিজের কাছেই রেখে দেন। খাতাগুলো না কেটেই উত্তীর্ণ ঘোষণা করেন প্রশিক্ষণার্থীদের।

এরপর এই প্রশিক্ষণের জন্য বিল করা হয় প্রথমে ৪৩ লাখ টাকা। আরটিএর পক্ষ থেকে রেল মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয়ে এ বিল পাঠানো হয়। এতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন আরটিএ প্রধান (রেক্টর) রুহুল কবির আজাদ। কিন্তু মন্ত্রণালয় ৪৩ লাখ টাকার বিপরীতে ১৯ লাখ দিতে সম্মত হয়। দুটি চেকের মাধ্যমে এ বিল পাঠানো হয় আরটিএ প্রধানের কাছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আরটিএর সংরক্ষিত একাউন্ট ও যৌথ একাউন্টে এ চেক জমা করা হয়।

এদিকে নিয়ম অনুযায়ী যে ১২ জন প্রশিক্ষক পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের ৩২ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন আরটিএর অধীনে, তাদের আর্থিক সম্মানী দেওয়ার কথা। কিন্তু সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রশিক্ষণ বিল বাবদ চেক জমা হয়ে গেলেও প্রশিক্ষকদের সম্মানী পরিশোধ করতে গড়িমসি শুরু করে আরটিএ। দেবে দেবে বলেই পার করে দেওয়া হয় দেড় বছর।

এর মধ্যে প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া লিখিত পরীক্ষার খাতা না কেটেই বিলের প্রক্রিয়া শুরু করে আরটিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা। পাশাপাশি প্রশিক্ষণার্থীদের উত্তীর্ণ ঘোষণা দিয়ে দেয় আরটিএ। ট্রেনিং শেষে স্পেয়ার লেটার (সাময়িক সনদ) দেওয়া হয় প্রশিক্ষণার্থীদের।

এরই মধ্যে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বর্তমান জিএম সরদার সাহাদাত আলী ভারপ্রাপ্ত রেক্টর হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর ওই প্রশিক্ষকরা তাদের সম্মানীর বিষয়ে যোগাযোগ করেন। তখন ভারপ্রাপ্ত রেক্টর তাদের সম্মানী পরিশোধ কেন হয়নি তা জানতে চান আরটিএর কর্মকর্তাদের কাছ থেকে।

এ সময় জানাজানি হয়, প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া লিখিত পরীক্ষার খাতাই কাটা হয়নি। যার কারণে ভারপ্রাপ্ত রেক্টর সরদার সাহাদাত আলী ওই প্রকল্পের চেকের কোনো টাকা উত্তোলনে সম্মত হননি। এর পরপরই তিনি খাতা কাটার নির্দেশনা দেন। প্রশিক্ষণের প্রায় ১ বছর ৩ মাস পর ওই প্রশিক্ষণার্থীদের খাতা কাটা হয় চলতি বছরের মার্চ মাসে। যদিও তাদের এক বছর আগেই উত্তীর্ণ ঘোষণা দিয়ে দিয়েছিল আরটিএ।

প্রশিক্ষকদের একজন বলেন, ‘২০২০ সালের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ কোর্স কো-অর্ডিনেটর আবুল কাসেম প্রশিক্ষকদের ডেকে প্রশিক্ষণার্থীদের খাতাগুলো দেন। পরে তারা কেটে তা জমা দেন। ১ বছর ৩ মাস পর কেন এই খাতাগুলো কাটা হল তা আমার কাছে রহস্যজনক মনে হচ্ছে। কারণ খাতাগুলো না কেটেই প্রশিক্ষণার্থীদের উত্তীর্ণ ঘোষণা করে বিল আত্মসাৎ করাই আবুল কাশেমের উদ্দেশ্য ছিল। যা বর্তমান রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলীয় জিএম ও ভারপ্রাপ্ত রেক্টর সরদার সাহাদাত আলীর কারণে সম্ভব হয়নি। তিনি যাচাই করার ফলে খাতা যে কাটা হয়নি তা উঠে এসেছে। আবুল কাশেমের উদ্দেশ্য ছিল নতুন যোগ দেওয়া ভারপ্রাপ্ত রেক্টরের স্বাক্ষর নিয়ে বিল তুলে নেওয়া। কিন্তু রেক্টর খাতা না কেটে বিল তোলার সুযোগ দেননি।’

জানা গেছে, কোর্স কোঅডিনেটর দায়িত্বে থাকা আবুল কাসেম গত ৮ জুন ফলাফলে স্বাক্ষর করেন। অথচ খাতা না কেটে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রায় দেড় বছর আগেই উত্তীর্ণ ঘোষণা করেন আবুল কাশেম।

পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সারোয়ার আলম বলেন, ‘৩২ জন কর্মকর্তার ট্রেনিং ব্যয় হিসেবে দুটি চেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে ১৯ লাখ পরিশোধ করা হয়েছে। রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির সংরক্ষিত একাউন্ট ও যৌথ একাউন্টে এ দুটি চেক জমা করা হয়।’

আরটিএতে প্রশিক্ষণ নেওয়া পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কর্মকর্তা মাহাফুজা সুলতানা বলেন, ‘আরটিএতে আমাদের ট্রেনিং শেষে স্পেয়ার লেটারে সকলকে উত্তীর্ণ লিখে দেওয়া হয় এবং সার্টিফিকেট ডাকযোগে পাঠানো হবে বলে জানানো হয়।’

অভিযোগ উঠেছে, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ১৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করতেই সব রকম চেষ্টা করেন সাবেক রেক্টর আনোয়ার হোসেন ও সিনিয়র ট্রেনিং অফিসার আবুল কাসেম। প্রকল্পের পুরো টাকা আত্মসাৎ করার সব আয়োজন সম্পন্ন করেন তারা। এর মধ্যে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর অবসর নেন রেক্টর আনোয়ার। তার কয়েক দিন পর ১৯ লাখ টাকার চেক আসে। অবসর যাওয়ার শেষ দিন রেক্টর আনোয়ার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন উচ্চমান সহকারী মাহমুদা খানমকে। কারণ প্রশিক্ষণের এই ভুয়া বিলসহ, জাল ক্রয় বিল, ফাইল স্বাক্ষর করতে অনীহা প্রকাশ করে আসছিলেন মাহমুদা। সেই সাথে ৩২ কর্মকর্তার খাতা না কেটে তাদের উত্তীর্ণ ঘোষণা করে বিল আদায়ের বিরুদ্ধেও কথা বলেছিলেন মাহমুদা খানম।

এ ব্যাপারে বক্তব্য নিতে আবুল কাসেমের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জিএম ও ভারপ্রাপ্ত রেক্টর সরদার সাহাদাত আলী বলেন, ‘তারা বলতে পারতো, প্রশিক্ষণার্থীরা সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে। উত্তীর্ণ কথাটা রেজাল্ট প্রকাশের সময় বলতে পারতো। এরা সব পণ্ডিতের পণ্ডিত। এটি কেমন কথা— আগে পাশ করিয়ে দিয়ে, পরে খাতা কাটা?’

তিনি আরও বলেন, ‘টাকা আমার হাতে। টাকা যখন আমার নামে আসবে এই টাকার জবাবদিহিতা আমার। আমার যেহেতু জবাব দিতে হবে আমি টাকা দেখে ও বুঝেই দেবো। আপনি খাতা কেটেছেন পাঁচটা। প্রতিটা খাতা যদি ২০ টাকা করে সম্মানী হয়, আমি সেটার ডকুমেন্ট দেখে আপনাকে ১০০ টাকা দেবো। আমি থাকতে অন্য কোনো উপায়ে বিল নেওয়ার সুযোগ নেই।’

watch price in bangladesh

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here