পাকিস্তানের বেলুচিস্তান জনগনের কাছে ‘বাংলাদেশ’ নামটি সবচে জনপ্রিয় ও তাদের সবচে অনুপ্রেরনাকারী দেশ।

0
138

২০১৭ সালের ১৬ই ডিসেম্বর, বাংলাদেশের বিজয় দিবসে বেলুচিস্তানের এক বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার একটি টুইট নিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। বেলুচিস্তান রিপাবলিকান পার্টির নেতা, ব্রহামদাগ বুগতি এই টুইটে বাংলাদেশকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছিলেন, “তারা (বাংলাদেশ) স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে তাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছিল সাহসী সংগ্রাম আর বিশাল আত্মত্যাগের মাধ্যমে। বালুচ জাতি একই ধরণের বিজয়ের প্রত্যাশা করে এবং আমরা আশা করি শীঘ্রই এই বিজয় আমরা অর্জন করবো।”

মিঃ বুগতি জেনেভায় বসে যে দলটির নেতৃত্ব দেন, সেটি একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী দল। তারা পাকিস্তান থেকে বেলুচিস্তানকে আলাদা করে সেখানে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম করতে চান। আর তাদের এই স্বাধীনতার সংগ্রামে বাংলাদেশকে একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচনা করেন।

বৈষম্যের অভিযোগ

পাকিস্তানে বালুচদের স্বাধীনতার লড়াই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেরও অনেক আগে শুরু হয়েছিল। এটা সত্যি, যে ধরণের বঞ্চনা-বৈষম্য এবং জাতিগত-সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন গতি পেয়েছিল, পাকিস্তানের বালুচদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার পেছনেও সেরকম অনেক কারণ নিহিত আছে।

আয়তনের দিক থেকে বেলুচিস্তান হচ্ছে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। বেলুচিস্তানের আয়তন ৩ লাখ ৪৭ হাজার ১৯০ কিলোমিটার, যা পাকিস্তানের মোট আয়তনের প্রায় ৪৩ শতাংশ। কিন্তু জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে ছোট। রাজধানী হচ্ছে কোয়েটা।

ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের বিবেচনায় পাকিস্তানের জন্য এই প্রদেশটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেলুচিস্তানের উত্তর-পূর্ব দিকে আছে পাকিস্তানের পাঞ্জাব এবং খাইবার পাখতুনখোয়া, পূর্ব আর দক্ষিণ-পূর্বদিকে সিন্ধু, দক্ষিণে আরব সাগর, পশ্চিমদিকে ইরান, আর উত্তর ও উত্তর-পূর্বদিকে আছে আফগানিস্তান।

প্রদেশের প্রধান জাতিগোষ্ঠী হচ্ছে বালুচ এবং পশতুন। বালুচরা প্রদেশের মোট জনসংখ্যার ৫২ শতাংশ। আর পশতুনরা ৩৬ শতাংশ। এর বাইরে আছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী – ব্রাহুইস, হাজারা, সিন্ধী, পাঞ্জাবি, উজবেক।

বেলুচিস্তানে আধা ডজন বিচ্ছিন্নতাবাদী দল বা গোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে স্বাধীন বেলুচিস্তানের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

বেলুচিস্তানের রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশেষ করে গ্যাস এবং কয়লার বিশাল মওজুদ। আছে তামা এবং সোনা। বালুচ জাতীয়তাবাদীরা বহু বছর ধরে অভিযোগ করে যাচ্ছে যে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তাদের শোষন করছে এবং বেলুচিস্তানকে তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছে।

অর্থনৈতিকভাবে বেলুচিস্তান এখনো পাকিস্তানের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল। পাকিস্তানের সরকারি চাকুরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বালুচদের বিরুদ্ধে বৈষম্যেরও ব্যাপক অভিযোগ আছে।

চীনের ভূমিকা

বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার আকাঙ্খার পথে এখন আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানকার একটি বিশাল অবকাঠামো প্রকল্পে চীন যুক্ত হওয়ার কারণে। চীনের ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বালুচিস্তানের গোয়াদার বন্দর প্রকল্প।

চীনের অর্থায়নে ‘চায়না পাকিস্তান ইকনোমিক করিডোর বা সিপেক নামের এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য গোয়াদার বন্দরকে পশ্চিম চীনের সঙ্গে যুক্ত করা। এর ফলে বন্দরটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হবে।

পাকিস্তানের রাজনীতিক এবং সেনা কর্মকর্তারা এই প্রকল্পটিকে একটি ‘গেম চেঞ্জার’ বলে বর্ণনা করে থাকেন। তাদের দাবি, এর ফলে বেলুচিস্তানের অর্থনীতিই পাল্টে যাবে।

কিন্তু বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো মনে করে, এ থেকে স্থানীয়রা কোনভাবেই লাভবান হবে না। তারা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করতে নিয়মিতই এই প্রকল্পের কাজে বাধা দিতে হামলা চালায়।

এই প্রকল্পটি একটি শ্বেত হস্তীতে পরিণত হতে পারে, এমন আশংকা অনেকের মধ্যে আছে। কিন্তু চীন এই প্রকল্প অব্যাহত রাখতে চায় এবং পাকিস্তান সরকারও যে কোন মূল্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করে প্রকল্পটি শেষ করতে চায়।

বাংলাদেশের সংগে বেলুচিস্তানের কোথায় পার্থক্য

বেলুচিস্তানের মানুষও সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের মতো চরম শোষণ-বৈষম্যের শিকার। সেখানে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দাবির প্রতি বিরাট সমর্থন আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব।

বাংলাদেশের বেলায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেভাবে মানুষের এই সমর্থনকে সংগঠিত করে এটিকে গণ আন্দোলনে রূপ দিতে পেরেছে এবং সঠিক পথে পরিচালিত করতে পেরেছে, বেলুচিস্তানের বেলায় সেটা অনুপস্থিত। কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় মূলত বেলুচিস্তানের সামন্ততান্ত্রিক ট্রাইবাল সমাজ ব্যবস্থা এরজন্য অনেকটা দায়ী।

watch price in bangladesh

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here