হাজার মানুষের ঢলে শুভ সূচনা চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেল রুটের

0
97

কেউ এসেছেন ১০ কিলোমিটার দূরের পথ হেঁটে। কেউ এসেছেন ঘোলাটে চোখে ছোটবেলার স্মৃতি ঝালিয়ে নিতে। কারও কোলে ছোট্ট শিশু, গায়ে শীতের কাপড়ও নেই অনেকের। তবুও তারা জড়ো হয়েছেন। বৃদ্ধরা নাতিদের বলছেন তাদের ছোটবেলায় ট্রেন দেখার গল্প। এমনই আনন্দময় এক দুপুর ছিল আজ চিলাহাটিতে। নীলফামারীর এই চিলাহাটি থেকে ৫৫ বছর পর আজ ট্রেন চালু হলো ভারতের হলদিবাড়ির পথে।

ট্রেন উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা সেরেছেন দুই দেশের দুই প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা আর নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছা বার্তা বিনিময়ের পর ট্রেন উদ্বোধনের ঘোষণা ভিডিও কনফারেন্সে চিলাহাটি রেলস্টেশনে বসে শুনেছেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ এলাকার গণ্যমান্য মানুষেরা। তবে তাদের পেছনে প্যান্ডেলে থাকা হাজার খানেক মানুষ উদ্বোধনের ঘোষণাতেই উল্লাস প্রকাশ করেন। আর চিলাহাটি থেকে হলদিবাড়ি যাওয়ার পথে পুরো রেলপথজুড়ে লানের দুপাশে এসে জড়ো হন হাজার হাজার মানুষ।

দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনী ভিডিও কনফারেন্স লাইভ দেখানো হয়।
বৃহস্পতিবার (১৭ ডিসেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ওই রেল যোগাযোগের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুই প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণার পর বেলা ১২টা ৪৬ মিনিটে চিলাহাটি স্টেশন থেকে ৩২টি মালবাহী ওয়াগনের বহর নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ট্রেনটি। এসময় রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন চিলাহাটি স্টেশনে বাঁশি বাজিয়ে ও সবুজ পতাকার সংকেত দিয়ে ট্রেনটির যাত্রা শুরুর সংকেত দেন।
দুপুর দেড়টার দিকে রেলবহরটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পৌঁছে। সেখানে দুই দেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিজিবি-বিএসএফ) মিষ্টি বিনিময়সহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে বেলা সোয়া দুইটার দিকে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতের সীমান্ত প্রবেশ করে রেলবহরটি।

চিলাহটি-হলদিবাড়ি রুটে মালট্রেন যাচ্ছে। তা উৎসুক হয়ে দেখছে স্থানীয় মানুষ। ৫৫ বছর পর চলা এই ট্রেন অনেকের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা।

ডোমার উপজেলার পূর্ব ভোগডাবুড়ি গ্রামের বৃদ্ধ পিয়ারুল ইসলাম। ৬৯ বছর বয়সে তিনিও এসেছেন রেল ট্রেন চলা দেখতে। বাংলা ট্রিবিউনের কাছে অনুভূতি প্রকাশ করে এই বৃদ্ধ বলেন,‘ছোটবেলায় এ পথে ট্রেন চলাচল করতে দেখেছিলাম। সে সময়ে ট্রেনে করে অনেকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে চলাচল করেছেন। ৫৫ বছর পর ফের সেই ট্রেন চালু হওয়ায় দৃশ্যটি উপভোগ করতে এসেছি।’

একই উপজেলার গোঁসাইগঞ্জ গ্রামের আরেক বৃদ্ধ আতিয়ার রহমান (৭০)। তিনিও এই বয়সে তিন কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে এসেছিলেন রেলপথের ধারে। সেই ছোট্টবেলায় চলাচল করা ট্রেন আবারও রেললাইন দিয়ে যাবে এটা দেখতেই ভীষণ উৎসুক হয়ে এসেছিলেন তিনিও। এরপর ভারতে রেলবহর যাওয়ার দৃশ্যটি উপভোগ করলেন মনোযোগ সহকারে। বাংলা ট্রিবিউন তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পুরোই নস্টালজিক হন তিনি। স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘ সেই অনেক আগে ট্রেন চালু ছিল, ট্রেনে চড়ে ভারতে আমার মামার বাড়িতে যাতায়াত করতাম। বন্ধ হলে আর যাওয়া হয়নি। এখন ট্রেন চালু হলো, আবারও হয়তো বেড়াতে যাওয়া হবে।’এসময় যাত্রিবাহী ট্রেন চলাচলের দাবি জানান এই বৃদ্ধ।

চিলাহটি-হলদিবাড়ি রেলস্টেশনে মানুষের ভিড়।

ট্রেললাইন চালু উপলক্ষে স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় স্থাপন করা হয় এক হাজার মানুষের ধারণ ক্ষমতার একটি তাঁবু। সেখানে বড় পর্দায় দেখানো হয় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর ভিঢিও কনফারেন্স। বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হওয়া ভিডিও কনফারেন্সটি সেখানে উপস্থিত এলাকাবাসী মনোযোগ দিয়ে দেখেন। এরপর ট্রেনে শুভ উদ্বোধন ঘোষণা হলে তারা উল্লাসে ফেটে পড়েন।

ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দীন সরকার, নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আহসান আদিলুর রহমান আদেল, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রাবেয়া আলীম, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম রেজা, রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. সামসুজ্জামান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদার, রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মিহির কান্তি গুহ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার শাহদাত আলী, জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরী, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান, ৫৬ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মামুনুল হক, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দেওয়ান কামাল আহমেদ, চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেল লিংক স্থাপন প্রকল্প পরিচালক আব্দুর রহীম প্রমুখ।

চিলাহটি-হলদিবাড়ি রুটে ট্রেল চলাচল দাঁড়িয়ে দেখছেন উৎসুক জনতা।

ব্রিটিশ আমল থেকে অবিভক্ত ভারতে যোগাযোগের প্রধানতম রেলপথ ছিল চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রুট। এই পথ দিয়ে নিয়মিত চলাচল করত দার্জিলিং থেকে খুলনা হয়ে কলকাতা পর্যন্ত একাধিক যাত্রিবাহী ও পণ্যবাহী ট্রেন। সে সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় এলাকায় হয়েছিল বিভিন্ন উন্নয়ন।

১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পথটি বন্ধ করে দেওয়া হলে স্থবির হয়ে পড়ে নীলফামারীসহ আশপাশ জেলার ব্যবসা বাণিজ্য। সে থেকে ব্যবসায়ীসহ এলাকার মানুষের দাবি ছিল আবারও রেলপথটি চালুর। এমন দাবিতে জেলায় ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ নানা কর্মসূচি পালন করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ ৫৫ বছর পর বর্তমান সরকারের উদ্যোগে আবারও রেলপথটি চালু হলো।

এ রেলবহরে ছিলেন চালক সহিদুল ইসলাম। তিন সহকারী চালক সাইফুল ইসলাম, কমল সরকার ও শাহজাহান আলীকে নিয়ে রেল ইঞ্জিন পরিচালনা করেন। তাকে নির্দেশনা দেন পরিচালক (গার্ড) আফজাল হোসেন ও সহিদুল ইসলাম।

ওই সংযোগ স্থাপনে চিলাহাটি থেকে হলদিবাড়ি সীমান্ত পর্যন্ত বাংলাদেশ অংশের ৬ দশমিক ৭২ কিলোমিটার রেললাইন স্থাপন করা হয়েছে। ৮০ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ের ওই  প্রকল্পে রেল লাইন স্থাপন ছাড়াও বসানো হয়েছে চার কিলোমিটার লুপ লাইন, আটটি লেভেল ক্রসিং ও নয়টি ব্রিজসহ অন্যান্য অবকাঠামো। চিলাহাটি রেল স্টেশনকেও আধুনিক সাজে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। অপরদিকে, হলদিবাড়ি থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত পর্যন্ত তিন কিলোমিটার রেললাইন স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করে ভারত।

সূত্র জানায়, উদ্বোধন ঘোষণার পর চিলাহাটি রেলস্টেশন থেকে পণ্যবাহী যে ট্রেনটি ছেড়ে যায় ভারতের হলদিবাড়ির উদ্দেশ্যে সেটিতে ছিল ৩২টি ভারতীয় খালি ওয়াগন। আর রেলবহরটিকে টেনে নিয়ে যায় বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি ইঞ্জিন। এসব ওয়াগন হলদিবাড়ি রেলস্টেশনে রেখে পুনরায় সীমান্ত অতিক্রম করে দেশে ফিরে আসে ইঞ্জিনটি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রেলপথমন্ত্রী  মো. নূরল ইসলাম সুজন বলেন, ‘এ পথে আপাতত দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করবে। আগামী ২৬ মার্চ থেকে পথটি দিয়ে ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যাত্রিবাহী ট্রেন চলাচলের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেল লিংক স্থাপনের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুর রহীম বলেন,‘১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর এ পথটি বন্ধ হয়। বর্তমান সরকার ২০১৫ সালে বন্ধ থাকা রেল লিংক পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। সে লক্ষ্যে ২০১৮ সালে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেল লিংকটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন বর্তমান রেলপথমন্ত্রী এবং ভারতীয় হাইকমিশনার। ইতোমধ্যে মেইন রেললাইনসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলো আমরা সম্পন্ন করেছি। ভারতও তাদের অংশের কাজ শেষ করেছে। উদ্বোধনের পর এ পথে বাংলাদেশ থেকে ভারত, নেপাল, ভুটান পর্যন্ত যাত্রিবাহী এবং পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করতে পারবে। ঢাকা থেকে ভারতের দার্জিলিং যাওয়ার জন্য এটি একটি বেস্ট রুটে পরিণত হবে। সে কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৬ মার্চ থেকে এ পথে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা করার পরিকল্পনা নিয়েছেন।’

জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের মধ্য দিয়ে ৫৫ বছর পর দুই দেশের রেল যোগাযোগের শুভ সূচনা হয়েছে। আগামী ২৬ মার্চ এই পথে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের উদ্বোধন হবে। যাত্রীবাহী ওই ট্রেনটি ঢাকা থেকে ছেড়ে এসে ভারতের শিলিগুড়ি পর্যন্ত যাবে।’

watch price in bangladesh

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here