এক কোণে বসে থাকা সেই তরুণের উপর রেগে গিয়েছিলেন শিকাগোর এক লাইব্রেরিয়ান

0
85

শিকাগোর এক লাইব্রেরিয়ান রোজ লক্ষ্য করতেন ঠিক দুপুরের দিকে এক ভারতীয় তরুণ যুবক লাইব্রেরীতে আসে, লাইব্রেরী কার্ড দেখিয়ে একসাথে অনেকগুলো বই তোলে, তারপর সব বইগুলো নিয়ে চলে যায় লাইব্রেরীর এক কোণে। তারপর ঝড়ের গতিবেগে সমস্ত বইগুলোর পাতা ওল্টাতে থাকে।

ঘন্টাখানেক পরে লাইব্রেরী ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে, সেই তরুণ যুবক সবকটা বই লাইব্রেরীতে জমা করে দিয়ে যায়। আবার পরের দিন আসে এবং নতুন আরও অবেকগুলো বই তোলে একই জিনিস করে। মনে মনে ভারী অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন লাইব্রেরিয়ান। ‘বই পড়বে নাই যখন, তখন এরকম করে শুধু পাতা উল্টিয়ে সময় নষ্ট করার মানে কী?’

একদিন আর থাকতে না পেরে সেই তরুণ যুবককে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, ‘তুমি বইগুলো পড়ো না যখন, রোজ নতুন নতুন বই তুলে কী করো?’ “যে কোনো বইয়ের যে কোনো পাতা থেকে প্রশ্ন করুন”, টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বইগুলোর দিকে ইশারা করে বলে উঠলেন তরুণ। লাইব্রেরিয়ান একটু ভুরু কুঁচকে, একটি বই হাতে তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট একটি পাতায় থেমে সেখান থেকে প্রশ্ন করলেন তরুণ কে।

তরুণ ব্যক্তি শুধু সেই প্রশ্নের উত্তর দিলেন না, তার সাথে সেই পৃষ্ঠার লাইন বাই লাইন প্রত্যেকটা শব্দ, দাঁড়ি কমা সমেত মুখস্ত বলে দিলেন ঝড়ের গতিবেগে। শিকাগোর লাইব্রেরিয়ান তখন মুগ্ধ চোখে চেয়ে আছেন এক ভারতীয় তরুণের দিকে… নরেন্দ্রনাথ দত্ত ওরফে স্বামী বিবেকানন্দ ১২ জানুয়ারি ১৮৬৩ সালে জন্মেছিলেন কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে। তাঁর ব্যাপারে জানে না, তাঁকে চেনে না এমন কোনও মানুষ হয়তো ভারতবর্ষে নেই।

তাই তাকে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। আজ তাঁর জন্মদিনে শোনাই তাঁর ব্যাপারে প্রচলিত কিছু শিক্ষণীয় গল্প। খুব ছোটবেলায় তিঁনি বিকালে বন্ধুদের সাথে খেলার সময় তাঁর বাড়ির পাশে একটি গাছে রোজ উল্টো হয়ে ঝুলতেন। তাই দেখে এক প্রবীণ প্রতিবেশী বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন।

যাতে বিবেকানন্দর চোট না লেগে যায় তাই তিনি বুদ্ধি করে গিয়ে ওনাকে বললেন, ‘উল্টো হয়ে গাছে ঝুললে ভূতে এসে গলা কেটে নিয়ে চলে যায়। কাল থেকে আর এরকম কোরো না’। এই শুনে স্বামীজীর বাকি বন্ধুরা প্রচন্ড ভয়ভীত হলো, তারা সব্বাই স্বামীজীকে বারণ করলো এরকম কাজ করতে।

কিন্তু স্বামীজী পরের দিন বিকেলে খেলতে এসে একইভাবে উল্টো হয়ে গাছে ঝুলে পড়লেন। তাই দেখে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে মানা করলো অনেক, কিন্তু তিঁনি তাদের বললেন ‘বোকার মতো ভয় পাস না। উনি আমাদের ভয় দেখানোর জন্য এরকম বলেছেন।

গাছে উল্টো হয়ে ঝুললে যদি ভুত গলা কেটে নিতো তবে এতদিন কাটলো না কেন?’। ওনার বয়স তখন মাত্র ৮ বছর। স্বামীজী একদম ছোট্ট থেকেই যুক্তিবাদী। নিজের চোখে কিছু না দেখে তাতে বিশ্বাস করেন না। একবার ট্রেনে করে তিঁনি কোথাও ভ্রমণে যাচ্ছিলেন। তাঁর বেশভূষা দেখে দু’টি মেয়ে তাকে উপহাস করতে শুরু করলো।

মেয়ে দু’টি এরপর স্বামীজীকে বলেন তাঁর হাতের মূল্যবান ঘড়িটা তাদের কে দিয়ে দিতে না হলে তারা চিৎকার করে লোক জমা করবে আর বলবে যে স্বামীজী তাদের সাথে অসভ্যতা করেছে।

স্বামীজী ছিলেন প্রচন্ড তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন। তিঁনি বোবা এবং কালার অভিনয় করে একটা পেন আর কাগজ তাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে ইশারায় বললেন, ‘তোমরা যা বলছো এই কাগজে লিখে দাও।’ মেয়েরা লিখলো ‘তোমার হাতের ঘড়ি খুলে আমাদের দিয়ে দাও, না হলে আমরা চিৎকার করে লোক ডাকবো, আর বলবো তুমি আমাদের সাথে অসভ্যতা করেছো…’

স্বামীজী এরপর সেই লিখিত কাগজ পুলিশের কাছে জমা দিয়ে দেন। এর থেকে বোঝা যায় স্বামীজী কতটা উপস্থিতবুদ্ধিসম্পন্ন ছিলেন। শিকাগোয় তিঁনি হিন্দু ধর্মকে রিপ্রেজেন্ট করতে যাওয়ার আগে মা সারদা দেবী তাঁকে বাড়িতে ভোজের নিমন্ত্রণ দেন। ভোজ সম্পন্ন হলে ফল আহরণের সময় আসে। স্বামীজী ছুরি দিয়ে নিজের ফল কাটছিলেন, এমন সময় মা সারদা দেবী স্বামীজীর কাছ থেকে ছুরিটি চান।

স্বামীজী ছুরিটি দেওয়ার পরেই সারদা দেবী বলেন, ‘তুমি পরীক্ষায় পাস করেছ। তুমি হিন্দু ধর্মের সঠিক পথপ্রদর্শক হিসাবেই বক্তৃতা দিতে যাচ্ছ।’ স্বামীজী জিজ্ঞেস করেন এ কথা বলার কারণ কী? তখন সারদা দেবী হেসে জানান, স্বামীজীকে যখন তিনি ছুরিটি চান, তখন স্বামীজী ছুরির তীক্ষ্ণ ভাগটি নিজের হাতে রেখে, উল্টোদিকের সুরক্ষিত ভাগটি সারদা দেবীর দিকে এগিয়ে দেন। ধর্ম ও ঠিক একই কাজ করে।

সে নিজে সমস্ত আঘাত সহ্য করেও তার আশ্রিতদের কে সুরক্ষিত রাখে। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ৪ই জুলাই ১৯০২ সালে স্বামীজী দেহত্যাগ করেন।

তাঁর জীবদ্দশায় তিঁনি নিজের গুরুর নামে নামকরণ করে প্রতিস্থাপন করেন রামকৃষ্ণ মিশন, যা আজও ভারতীয় যুব সমাজকে অন্য ভাবে ভাবতে শেখায়, অন্য ভাবে গড়ে তোলে তাদের আদর্শ, মতবাদ, চিন্তাধারা। আজ তাঁর জন্মদিন। ভারতবর্ষে বিবেকানন্দর চিন্তাধারা প্লাবনের মতো বহমান হোক, সর্ব ধর্মের সমন্বয় হোক। এটুকুই কামনা।

watch price in bangladesh

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here