পেশাগত দায়িত্বে পালনের সময় গণমাধ্যম-কর্মীদের নামে মামলা ও জরিমানা করেছে পুলিশ।

0
50

জরুরি সেবা-খাতে নিয়োজিত কর্মীদের যাতায়াতে মুভমেন্ট পাস লাগবে না জানানো হয়েছিলো, তবুও পেশাগত দায়িত্বে পালনের সময় গণমাধ্যম-কর্মীদের নামে মামলা ও জরিমানা করেছে পুলিশ।

এর আগে গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে ‘মুভমেন্ট পাস’ উদ্বোধনের সময় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘সাংবাদিকদের সড়কে চলাফেরার জন্য ‘মুভমেন্ট পাস’ প্রয়োজন হবে না। তবে অন্য পেশার যারা প্রয়োজনে বাইরে বের হতে চান তাদের এই পাস নিতে হবে।’

আইজিপি বলেন, ‘সরকারি প্রজ্ঞাপনে সাংবাদিকসহ জরুরি সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের চলাফেরায় বাধা দেওয়া হয়নি। তাই সাংবাদিকদের এই পাস সংগ্রহ করতে হবে না।’

তাহলে পুলিশ কেন নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ এনে সাংবাদিকদের মামলা বা জরিমানা করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিধি-নিষেধের প্রথম দিনের পর দ্বিতীয় দিনেও পেশাগত দায়িত্বে বের হওয়া গণমাধ্যম-কর্মীরা হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

লকডাউনের প্রথম দিনেই হয়রানির শিকার হন দৈনিক মানবজমিনের ফটো সাংবাদিক জীবন আহমেদ। পেশাগত কাজে বের হয়ে মামলা হওয়ার বিষয়টি তিনি তার ফেসবুক পোস্টে তুলে ধরেন।

জীবন আহমেদ তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘বুঝলাম না ডাক্তার ও সাংবাদিকদের গাড়িতে কেনো পুলিশ মামলা দিচ্ছে, এগুলো তো জরুরি সেবা। আমাকেও চার হাজার টাকার মামলা দিল। আমি পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় ছবি তুলতে আগারগাঁওয়ে পুলিশের চেকপোস্টের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। ক্যামেরা বের করার আগেই আমাকে চার হাজার টাকার মামলা ধরিয়ে দেওয়া হলো।’

জীবন আহমেদ জানান, অন্য সবার সঙ্গে আমাকে লাইনে ফেলে মামলা দিয়ে দিল পুলিশ। আমি সাংবাদিক বলার পরেও আমাকে চার হাজার টাকার মামলা দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন ঢাকা পোস্ট.কম এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাঈদ রিপন। বৃহস্পতিবার সকালে ওই এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিজের মোবাইলে ধারণ করার সময় কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা তার ফোন নিয়ে নেন।

এ বিষয়ে ঢাকা পোষ্টের সিনিয়র রিপোর্টার সাঈদ রিপন বলেন, ‘আমি পেশাগত দায়িত্ব পালনে আমার ফোন দিয়ে ছবি ও ভিডিও করছিলাম। এ সময় পুলিশের কাছাকাছি গেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিরপুর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার আ. স. ম. মাহতাব উদ্দিন বলেন, এই আপনি কে? এমন প্রশ্নের জবাবে গলায় ঝুলানো অফিসের আইডি কার্ড দেখালে, তিনি কার্ড ধরে বলেন, কিসের ঢাকা পোস্টের সাংবাদিক। এই কথা বলার পরই মোবাইল কেড়ে নিয়ে ডিসি নিজেই ভিডিও ধারণ করতে থাকেন।’

সাঈদ রিপন আরো বলেন, ‘ডিসি ভিডিও করার সময় বলেন, আপনি কিসের সাংবাদিক, কিসের ভিডিও করছেন বলেন। ঢাকা পোস্টের কি প্রেসক্লাবের নিবন্ধন আছে? ডিসি কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নিজের গাড়িতে উঠে যান। গাড়িতে উঠে বলেন, প্রেসক্লাবে নিবন্ধনের কাগজ দেখিয়ে আমার অফিস থেকে মোবাইল নিয়ে যাবেন।’

এ প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডিএমপির মিরপুর জোনের ডিসি একজন সিনিয়র কর্মকর্তা। তিনি এটা কেন করলেন বুঝতে পারছি না। তাছাড়া সাংবাদিকদের আটকে রাখা বা মোবাইল নেওয়ার কোনো নির্দেশনা ডিএমপি বা সরকার দেয়নি।’

শুধু রাজধানীতে নয় বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের একাত্তর টেলিভিশনের শামিম নামের স্থানীয় এক প্রতিনিধি ওয়াজখালি থানার পুলিশ দ্বারা হয়রানির শিকার হন।

শামিম তার ফেসবুকে পোষ্টে লিখেন, ‘একাত্তর টিভিতে হাওরের স্টোরি নিয়ে লাইভ দিয়ে আসলাম। ওয়েজখালিতে জনাব রাজ্জাক নামের একজন পুলিশ থামালেন। কিছু না বলেই চাবি নিয়ে নিলেন। বেয়াদবিটা সহ্য হলো না। তাই মুখ ছোটালাম। আমি লকডাউনের আওতা বহির্ভূত পেশাজীবী। একাত্তর টিভি ও কালের কণ্ঠে কাজ করি। বললেন, মুভমেন্ট পাস দেখান। বললাম আমার জন্য মুভমেন্ট পাস প্রযোজ্য নয়। তিনি বেহুদা কথা বাড়াচ্ছেন কোথাও বলা হয়েছে আপনি লকডাউনের আওতাভুক্ত দেখান। বললাম সরকারি ১৩ দফা নির্দেশনা আপনার মোবাইল সার্চ করে জেনে নিন। ফালতু প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য নই। এ কথায় তিনি কোল্ড হওয়ার বদলে আরও গরম হলেন। বললেন ডিসি ইউএনও সাহেব বললে গাড়ি দেব। আমি বললাম ঠিকাছে বাইক রেখে দিন আমি চললাম।’

এদিকে গত দুই দিন ধরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, শাহবাগ ও জাহাঙ্গীর গেট এলাকায় আরও বেশ কয়েকজন গণমাধ্যম-কর্মী এমন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জরুরি সেবা ও সাংবাদিকদের যে মুভমেন্ট পাস লাগে না সে বিষয়টি মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা অনেকেই জানেন না। তাই তারা এমন আচরণ করছেন।

এছাড়াও গত দুইদিন ধরে জরুরি চিকিৎসা সেবায় বের হওয়া চিকিৎসকদেরও বিভিন্নভাবে হয়রানি করেছেন পুলিশ সদস্যরা। শুধু হয়রানিই নয়, অনেকে জরিমানারও শিকার হয়েছেন।

এ বিষয়ে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে জানানো হয়, জরুরি সেবা সংশ্লিষ্ট লোকজন যারা আছে তাদের কোনও ধরনের মুভমেন্ট পাস প্রয়োজন নেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এই সমস্যা দূর করার জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছেন।

উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসের ভয়াবহ দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। প্রতিদিনই মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে সর্বাত্মক কঠোর লকডাউন আরোপ করেছে সরকার। বুধবার সকাল থেকে অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার।

সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জরুরি সেবা ছাড়া সরকারি-বেসরকারিসহ সবধরনের অফিস, গণ-পরিবহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ থাকবে। মাঠ-পর্যায়ে বিষয়টি নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ প্রশাসন। কেউ যেন অপ্রয়োজনে বাইরে ঘোরাফেরা করতে না পারে সেজন্য রাজধানীজুড়ে বসানো হয়েছে পুলিশের চেক পোস্ট। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের থানা ও ট্রাফিক বিভাগের সম্মিলিত টহলও জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের মুভমেন্ট পাস ও জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত কাউকে বাইরে চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না।

watch price in bangladesh

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here