জীবন যুদ্ধে হার না মানা “জরিনার মা”

0
95

মাহবুব কিরণ মানিক : জন্মের পর থেকেই কেউ কেউ সুখে বসবাস করেন আবার কেউ কেউ সারা জীবন সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। আর যারা জীবন চালাতে সংগ্রাম করে, তাদের জীবনের সংগ্রাম যেন শেষই হয় না। এমনই এক সংগ্রামী নারী ডেমরার বড়ভাংগার তাহেরা বেগমে “জরিনার মা”। ৫৫ বছর বয়সী তাহেরা বেগম থাকেন রাজধানীর ডেমরার বড়ভাংগা এলাকায়। স্থানীয়রা তাকে ডাকে “জরিনার মা” নামে। কয়েক বছর আগে স্বামী মোকলেস ঢালী মারা যান। তার দু’টি ছেলে ও একটি মেয়ে থাকলেও তিনি এখন বসবাস করেন একা। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে বেশ কয়েক বছর আগে। রাজজুগালী কাজ করা ছেলের তেমন আয় রোজগার না থাকায় মায়ের খুজ খবর নিতে পারে না। কিন্তু তাহেরা বেগমের (জরিনার মা) পেট তো চালাতে হবে। অভাবের তাড়নায় জীবনের তাগিদে শাক সবজি নিয়ে ভ্যানে করে ডেমরা এলাকার আনাচে কানাচে ছুটে বেড়ান বিক্রির জন্য। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে তিনি যাত্রাবাড়ী থেকে সবজি কিনে ডেমরার বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন।

আজকাল সবক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ সমানভাবে থাকলেও ফেরিওয়ালার কাজে সাধারণত মহিলাদের দেখা যায় না। কিন্তু বড়ভাংগার তাহেরা বেগমের(জরিনার মা) অভাবী ছেলের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে এ কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রথমে কিছু লোক তার এ পেশাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। অনেকেই হাসি-ঠাট্টা ও সমালোচনা করতো। আবার কিছু লোক তাকে সহযোগিতাও করেছেন।

রাজধানীর ডেমরার বড়ভাংগা এলাকায় তাহেরা বেগমের(জরিনার মা) সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, জন্ম হয় বাবার অভাবের সংসারে। বিয়েও হয়েছিল এক দিনমজুরের সঙ্গে। অধিকাংশ সময়ই স্বামী অসুস্থ থাকয় ঠিক মতো সংসার চালাতে পারতো না। তাই সেখানেও লেগে থাকতো অভাব। এদিকে স্বামী অসুস্থ, দুই ছেলে এক মেয়েও ছোট কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। আর তখন থেকেই সংসারের বোঝা কাধে নিয়ে শুরু করলাম বিভিন্ন ধরনের কাজ। কখনো রাস্তা ঝাড়ু কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ।

নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সামান্য কিছু টাহা জোগাইয়া ব্যবসায় নামছি। ছেলেরাই ঠিক মতো সংসার চালাইতে পারে না তাই ছেলের বোজা অইতে চাই না। হাত পায় এহনও বল আছে। তাই তো ফেরি কইরা খাই।

কেমন বেচা কেনা হয় জানতে চাইলে তাহেরা বলেন, কোনোদিন ভালো বেচাকেনা অয়, কোনোদিন আবার অয় না। বেচাকেনা ভালো অইলে২০০/৩০০টাহা লাভ অয়। আবার কোন দিন সবজি নষ্ট অইয়া গেলে চালান ও আইয়ে না। আমারতো অত টাহা নেই যে একটা দোহান দিমো। যা ইনকাম অয় তা দিয়ে কষ্ট কইরে চলতে অয়। নিজের বাড়ি নাই জমি নাই। ছোট্ট একটা রোমে তিন হাজার টাহা দিয়া কোনো রকম ভারা থাহি।

জীবন যুদ্ধে হার না মানা এ নারীর মতে, দেশের সব নারীকে কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আসা উচিত। লোকে কী বললো তার দিকে না তাকিয়ে কাজ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তার কর্মজীবনেও প্রথম প্রথম কাজ করতে তিনি অস্বস্তি বোধ করতেন। ভাবতেন লোকজন কে কী বলবে। এখন তার কাছে সেটা আর কোনো ব্যাপার বলে মনে হয় না।

ওই এলাকার বাসিন্দা মানিক বলেন, তাহেরা বেগমকে আমরা ছোট বেলা থেকে দেখেছি। অবিরাম জীবন যুদ্ধে হার না মানা এক নারী তিনি। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে প্রতিনিয়ত বেঁচে আছেন। এক সময় তিনি আমাদের বাসায় কাজ করতেন। আমরা তাকে জরিনার মা বলে ডাকতাম। এখন নিজেই সবজি ফেরি করেন। তিনি আরও বলেন, কোনো কাজকেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। নারীরা অনেক সময় চক্ষুলজ্জার ভয়ে ঘর থেকে বের হতে চান না। কিন্তু জরিনার মা সেসব কথায় কান না দিয়ে নিজেই নিজের মতো করে কাজ করে চলেছেন।

watch price in bangladesh