বিদেশে বসেই ঢাকার আন্ডার ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে ৪ শীর্ষ সন্ত্রাসী

0
9

বিদেশ থেকে রাজধানীর আন্ডার ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে সরকারের পুরস্কারঘোষিত চার শীর্ষ সন্ত্রাসী। এরা হচ্ছে ওমর ফারুক কচি, শাহাদাত হোসেন, বিকাশ ও প্রকাশ। কচি দেশের বাইরে পলাতক। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতেও স্থানীয় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের ঘুম হারাম হবার উপক্রম হয়েছে। কারণ দেশের বাইরে থেকেই কচি এলাকার চাঁদাবাজির নেটওর্য়াক নিয়ন্ত্রণ করছে বাহিনীর মাধ্যমে। কচি বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে যারা এলাকায় সক্রিয় আছে তারা হচ্ছে ইরফান, রকিব লম্বা সেলিম, বস্তি শহীদ বিল্লাল হিমেল ও হাসানগাজি। এরা শ্যামপুর, জুরাইন, পোস্তগোলা বাহাদুর পুর লেন, ফরিদাবাদ গেন্ডারিয়া ও মিলব্যারাক ও বাংলাবাজার ঋষিকেশ দাস লেন, লালকুঠি, শ্যামবাজার, দয়াগঞ্জ মীর হাজিরবাগ ও আশপাশ এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে হুন্ডির মাধ্যমে কচির কাছে টাকা পাঠায়। লম্বা সেলিম ও হাসান গাজি ক্যাশিয়ার হিসেবে এই টাকা জমা করে। পরে কচির নির্দেশনা অনুযায়ী একটা অংশ কচির কাছে পাঠানো হয় বাকী অংশ সহযোগীদের মধ্যে বন্টন করা হয়।
এছাড়া বাহাদুরপুর কল্যান সংঘের ব্যানারে স্থানীয় শশ্মান ঘাট হাটের ইজারা আনে যা দেশের বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে কচি। হাট থেকে উপার্জিত অর্থের উল্লেখযোগ অংশ হুন্ডির মাধ্যমে কচির কাছে চলে যায়। কারাবন্দি সহযোগীদের ছাড়াতে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর সোনালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তার কাছে ফোনে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাকে ব্যাংক বাসা থেকে তুলে নেওয়ারও হুমকি দেয় কচি বাহিনীর সদস্যরা।
এ বিষয়ে ওই কর্মকর্তা ৬ ডিসেম্বর মতিঝিল থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। থানা তার অভিযোগটি জিডি হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। জিডি নাম্বার ৩৯১।
আরসিন গেইট এলাকার এক ভুক্তভোগী জানান, গত ৯ জুলাই রাতে শাহেদ নামে এক যুবক খুন হয়। শাহেদ মাদক ব্যবসায় বাধা দিতে গিয়ে তাদের হাতে প্রাণ হারায়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, খুনিরা কচি গ্রুপের সন্ত্রাসী। শাহেদকে খুন করে পালানোর সময় স্থানীয়রা পাপ্পু নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশে দেয়। পরে পুলিশ তার সহযোগী হাবুকেও গ্রেফতার করে। এ হত্যার সঙ্গে মালেক ও রহমান নামে দুই মাদক ব্যবসায়ী জড়িত। কিন্তু কচির প্রভাবে তারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের মামলা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য বাদীপক্ষকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে। রহমান ও তার ছেলে তুষার এবং মুন্নাও শীর্ষ সন্ত্রাসী কচির হয়ে কাজ করে। তারা গেন্ডারিয়া এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত।
শ্যামপুরের আরেক অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে কচির মদদপুষ্ট আরিফ, বিকি, মিঠু, রানা, সাঈদ, তারিকসহ বেশ কয়েকজন। এদের বেশিরভাগই আবার মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, যাত্রাবাড়ি থেকে শুরু করে ফরিদাবাদ এলাকা পর্যন্ত প্রায় ২ শতাধিক শিল্প কারাখনা রয়েছে। এসব শিল্প কারখানার অধিকাংশই কচির নিয়ন্ত্রণে। সন্ত্রাসীরা নিয়মিত চাঁদা প্রদানকারী ব্যাক্তিকে কাস্টমার বলে। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারাখানা থেকে ( মান্থলি) নিয়মিত টাকা আহরণের পর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা কচির কাছে চলে যায়। বাকী টাকা কচির কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়ে অন্যান্যরা নিজেদের মধ্যে বন্টন করেন। কচি বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করলেও সে মাঝে মধ্যে নেপালেও যাতায়াত করে বলে খবর রয়েছে।
মিরপুরের আরেক টপটেরর শাহাদাত রয়েছেন কলকাতায় কিন্তু এলাকায় তার নামে, নিয়মিত চাঁদা তুলছে তার বাহিনীর সদস্যরা। কেউ কোনো অভিযোগ না করে নিরবে নিভৃতে চাঁদা প্রদান করায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কোনো এ্যাকশনে যেতে পারছে না। প্রতিমাসে মিরপুর এক ২ ও ১০ নম্বরের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা উঠছে। আহরিত চাঁদার উল্লেখযোগ্য অংশ হুন্ডির মাধ্যমে চলে যাচ্ছে শাহাদাতের কাছে। বাকী টাকা শাহাদাতের নির্দেশনা অনুযায়ী সহযোগিরা নিজেদের মধ্যে বন্টন করে।
আগারগাঁও এলাকার আরেক ত্রাস সরকারের পুরস্কারঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাস কুমার দাস। বিকাশ আছেন ফ্রান্সে। সেখানে ছোট ভাই আরেক টপ টেরর প্রকাশের কাছে উঠেছেন। প্রকাশ আগে থেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে ফ্রান্সে অবস্থান করছিলেন।
২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর কাসিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েই বিকাশ যশোরের বেনাপোল বন্দর দিয়ে কলকাতায় ঢুকেন এরপর কলকাতা ছেড়ে তিনি এখন আছেন ফ্রান্সে। ঠান্ডা মাথার খুনি হিসেবে পরিচিত এই বিকাশের বাবার নাম বিমলকুমার বিশ্বাস। বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার শিবনগরে। ঢাকার মিরপুর পাইকপাড়া তাদের বাসা। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যে শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা করেছিল, তাতে বিকাশ-প্রকাশের নাম ছিল। ওই তালিকার পরই প্রকাশ ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি আইন বিষয় নিয়ে লেখাপড়া করেন।
বর্তমানে তিনি রয়েছেন ফ্রান্সে। প্রায়ই তাকে সেখানকার বাঙালিদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা যায়। সেখানে বেড়াতে যাওয়া পূর্বপরিচিত অনেক বাংলাদেশির আতিথেয়তা মেলে প্রকাশের বাসায়। তবে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ হলেও প্রকাশের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দাদের কাছে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই।
সূত্র জানায়, বিকাশ আর প্রকাশ বর্তমানে ফ্রান্সে থাকলেও তাদের নামে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে ঢাকায়। ঢাকা থেকে পাঠানো মোটা অঙ্কের টাকায় তারা ফ্রান্সে আলিশান জীবনযাপন করছেন।
আগারগাঁও পিডব্লিউডির টেন্ডার এখনো নিয়ন্ত্রণ করছেন বিকাশ। জেলে থাকতেও তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ফ্রান্স থেকে টেলিফোনে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার সহযোগীদের সঙ্গে। আদেশ-নির্দেশ দিচ্ছেন। সেভাবেই তার শিষ্যরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালের দিকে পাইকপাড়াকেন্দ্রিক মস্তানি করতেন বিকাশ। সেই সময়ে এশিয়া সিনেমা হলের টিকিট কালোবাজারির প্রধান রমজানকে হত্যা করেন। রমজানকে খুনের মধ্য দিয়েই মূলত তার আন্ডারওয়ার্ল্ডে হাতেখড়ি। রমজান খুন এবং বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তার ছোট ভাই প্রকাশ মিরপুর বাঙ্লা কলেজের তখন ছাত্র। বড় ভাইয়ের এই নামডাকের কারণে প্রকাশ বিভিন্ন স্থানে সমীহ পেতে থাকেন। ধীরে ধীরে তিনিও গ্রুপ তৈরি করেন। বড় ভাইকে সহযোগিতা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে বিকাশ-প্রকাশ বাহিনী হিসেবে শক্তিশালী বাহিনীর আত্মপ্রকাশ ঘটে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে।
সূত্র জানায়, আগারগাঁও পিডবিব্লডির টেন্ডারে হাত বাড়ান বিকাশ-প্রকাশ। বাধা হয়ে দাঁড়ান আরেক সন্ত্রাসী শামীম। পিডব্লিউডির ভিতরই শামীমকে গুলি করে হত্যা করে বিকাশ-প্রকাশ বাহিনী। সঙ্গে শামীমের সহযোগী মামুনও খুন হন। জোড়া খুনের পর বিকাশ-প্রকাশের নাম আরও ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রলীগ নেতা জরিপকে হত্যার পর বিকাশ আর প্রকাশ এ গ্রেডের অপরাধী হিসেবে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নাম লেখান।
মিরপুর, সাভার, ইব্রাহীমপুরসহ আশপাশ এলাকায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েন তারা। হয়ে ওঠেন শক্তিশালী ফাইভ স্টার গ্রুপের সদস্য। এসব ঘটনার পর বিকাশ-প্রকাশ তখন অপরাধ সাম্রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাট । তাদের অস্ত্রের ভান্ডারে অত্যাধুনিক সব ক্ষুদ্রাস্ত্র মজুদ ছিল। কিন্তু এখন তাদের ফোনে কাঁপছে আগারগাঁও ও আশপাশ, এলাকা। এরা স্থানীয় ঠিকাদারী নিয়ন্ত্রণ করছে-স্থানীয় যুবলীগের কতিপয় কর্মী ক্ষোদ বিকাশ গ্রপের সদস্য। ফলে চাঁদা বা ঠিকাদারি সব কিছুই চলছে ফ্রান্সে থাকা বিকাশ প্রকাশের নির্দেশনা অনুযায়ী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here